চলছে প্রকাশ্যে চাদাঁবাজি ; নিরাপত্তার মাঝেও কমেনি অপরাধপ্রবণতা
নতূন উদ্যেগে শুরু হয়েছে পুরো ঢাকা জুড়ে চাঁদাবাজি। এটা এখন একদমই প্রকাশ্যে। তাও আবার পুলিশ চেকপোষ্টের সামনে। এমনই চিত্র চোখে পরল ঢাকার প্রেসক্লাব মোড়ে। মিরপুর টু মতিঝিলগামী শতাব্দি পরিবহনে চলছিল এই ঘটনা। একটা যুবক গাড়িতে উঠেই বাসের কন্টাকদারের কাছে টাকা দাবি করলেন। বিরক্ত ভঙ্গিতে একরকম বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে বিদায় করলেন। এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে তিনি জানালেন শুধু এখানে নয় আমাদের মিরপুর থেকে মতিঝিল আসতে ৩ থেকে ৪ জায়গায় চাঁদা প্রদান করতে হয়। একই অভিযোগ মৈত্রি পরিবহন, বাহন পরিবহন সহ এই লাইনের বাকি বাস মালিকদের। চাঁদা না দিলে নানাভাবে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে এই চাঁদার বিরাট একটা অংশ যায় পুলিশের পকেটে। শুধু বাসে নয় চাঁদাবাজি চলে টেম্বু এবং সিএনজিতেও। ঝিগাতলা থেকে মিরপুর ১ এ যে টেম্পুগুলো চলে তাদের যেতে ৩ যায়গায় চাঁদা দিতে হয়। প্রথমে ঝিগাতলা এপর শ্যামলি এবং শেষে মিরপুর। চাঁদার পরিমানও নিহাত কম নয়। ঝিগাতলা টেম্পু প্রতি দিতে হয় ৪০ টাকা। শ্যামলিতে সবচেয়ে বেশি দিতে হয়। এখানে দিতে হয় প্রায় ১৫০ টাকা । আর মিরপুরে ৭০ টাকা।
এই চাঁদার পরিমান ঈদ উপলক্ষ্যে বাড়িয়ে দিয়েছে চাদাঁবাজরা। পুলিশও এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করছে না। এই প্রতিবেদক কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করতে বা এর ব্যাখ্যা চাইতে জাননি। কারন, পুলিশ তাদের সেই মুখস্থ বাক্য আউরিয়ে দিবেন “এমন কথা আমরা শুনিনি। যেহেতু অভিযোগ উঠেছে সেহেতু বিষয়টা ক্ষতিয়ে দেখা হবে।”।
চলতি রমযান মাসে আইন-শৃক্মখলা বাহিনীর বাড়তি তৎপরতা সত্ত্বেও কমেনি অপরাধ প্রবণতা। প্রতিদিনই রাজধানীতে ঘটে চলেছে খুন, ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি। চলছে জাল টাকা ও মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা-অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টি ও টানাপার্টির দৌরাত্ম্য। বাড়তি এ নিরাপত্তার মধ্যেও যেভাবে অপরাধ বেড়ে চলেছে তাতে করে বিশেষ এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।
তবে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নুরুন্নবী বলেন, যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কোনো গ্রুপ সংঘবদ্ধভাবে কোনো অপরাধ কর্মকান্ড করছে না দাবি করে তিনি বলেন, আইন-শৃক্মখলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে এবারে সংঘবদ্ধ গ্রুপের চাঁদাবাজি কিংবা ছিনতাই নেই। যে ক’টি ঘটনা ঘটেছে সেসব ঘটনায় দোষীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রমযান মাসে রাজধানীতে অপরাধ প্রবণতা আগের মাসগুলোর চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ বছর গত ২০ জুলাই পবিত্র রমযান মাস শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এবারের রমযানে অপরাধ প্রবণ কর্মকান্ড ঠেকাতে আইন-শৃক্মখলা বাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা বেশ কয়েকবার সভা করে তিন স্তর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। এর আওতায় শুধু রাজধানীতে ৪০টি অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক চেকপোস্ট, ৩৩৪টি ফুট পেট্রোল টিম, ৮৪টি মোটর সাইকেল পেট্রোল টিম ও ১৫টি মোবাইল পেট্রোল টিম প্রতিদিন কাজ করছে।
সূত্র জানায়, গতবারের চেয়ে এবারের টহল টিমের সংখ্যাও বেশি। কিন্তু এতসব ব্যবস্থার পরও রাজধানীর আইন-শৃক্মখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই বলে মনে করেন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। পুলিশের এই তিন স্তর নিরাপত্তার মধ্যেও বাড়ছে খুন, ছিনতাই, ডাকাতির মত অপরাধের ঘটনা। সেই সঙ্গে বাড়ছে জাল টাকা ও মাদক ব্যবসা, রাস্তায় অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টি ও টানাপার্টির দৌরাত্ম্য।
ডিএমপির মিডিয়া সেল থেকে প্রাপ্ত তথ্যে সম্প্রতি অপরাধমূলক যে বড় ঘটনাগুলো ঘটেছে সেসবের মধ্যে গত ২২ জুলাই রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার মোল্লাপাড়া এলাকায় জমশেদ (৫০) ও জাবেদ (৩৫) নামে দুই ভাইয়ের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। পুলিশ এখনো এই জোড়া ‘খুনের’ (মৃত্যু) কোনো সুরাহা করতে পারেনি। পরদিন ২৩ জুলাই রাতে অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে কয়েক লাখ টাকা খোয়ান ৪ ব্যক্তি। ২৪ জুলাই মিরপুরে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির গুলীবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়, একইদিন কেরাণীগঞ্জে দু’পক্ষের গোলাগুলীতে মারা যায় একজন। ২৬ জুলাই র্যাবের ক্রসফায়ারে সুমন নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়। র্যাব জানায়, সুমন ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান। ওইদিন রাতে হাজারিবাগে এক মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ অফিসে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। এছাড়া রাজধানীর কুড়িলে এক বিএনপি নেতার বাসায় লোকজনকে হাত-পা-মুখ বেঁধে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা ওই বাসা থেকে ১০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় ৬ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় বলে জানা গেছে। ২৭ জুলাই রাজধানীর গুলশানে ফজলুল হক নামের এক ব্যবসায়ীকে জবাই করার ঘটনা ঘটে। একইদিন শান্তিনগরে সন্ত্রাসীরা এক ব্যবসায়ীকে গুলী করলে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এক রিকশাচালকের গায়ে লাগে। ২৮ জুলাই রাতে বংশালে চাঁদার দাবিতে মামুন নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলী করে হত্যা করা হয়। গত ২ আগস্ট যাত্রাবাড়ির গোলাপবাগ এলাকায় আড়াই বছরের এক শিশুর লাশ পাওয়া যায়। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা শিশুটিকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। এছাড়া জুলাইয়ের শেষদিন রাজধানীর দক্ষিণখানে সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাকে সস্ত্রীক হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনার বাইরেও প্রতিনিয়িত চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। ঈদ মওসুমকে সামনে রেখে মাদক ব্যবসায়ীরা মাদকের মজুদ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে। আর জাল টাকার সংঘবদ্ধ চক্রগুলোও বিভিন্ন কায়দায় বাজারে জাল টাকা ছাড়ছে। এছাড়া রাস্তাঘাটে সক্রিয় রয়েছে মলমপার্টি, অজ্ঞানপার্টি ও টানাপার্টির সদস্যরা।
এদিকে রমযান শুরুর পর থেকে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়, জাল টাকার ব্যবসা ও হত্যার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে বলে দাবি করলেও এসব কর্মকান্ডে কোনো ভাটা পড়েনি। তাই রমযানের বিশেষ নিরাপত্তাদ’ও এতোটুকু স্বস্তি দেয়নি সাধারণ মানুষকে।
রাজধানীর কাওরান বাজারের পাইকারী সবজি বিক্রেতা আব্দুল খালেক শনিবার জানান, রমযানের আইন-শৃক্মখলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন তার প্রশ্ন: চাঁদাবাজি কি কমেছে? ছিনতাই কমেছে? খুনের ঘটনা কি কমেছে? খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কোনোটিই কমেনি বলে দাবি করে তিনি বলেন, আসলে এসবই লোকদেখানো। নিজেদের সতর্কভাবে চলাফেরা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। তিনি আরও বলেন, আমার কাছ থেকে কেউ চাঁদা চাইলে আমি যদি পুলিশে বলি তাহলে আমার নিরাপত্তা কোথায়? আমি নিজেই বাঁঁচতে পারবো না। সেহেতু আমার আপস করাই ভাল।
একই কথা বলেন ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা চাঁদা চায় এটা ঠিক আছে। কিন্তু রমযানে পুলিশের চাঁদাবাজিও বড় চাঁদাবাজি। এর শিকার আমরা ব্যবসায়ী।
রমযানের এই বিশেষ নিরাপত্তা আর এর বিপরীতে অপরাধ প্রবণতা নিয়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নুরুন্নবী। তিনি বলেন, আসলে এবারের ঈদে কোনো সংঘবদ্ধ গ্রুপের চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের ঘটনা নেই। এটা পুলিশী তৎপরতার কারণে সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, পুরান ঢাকায় গত ঈদেও ডাকাত-শহীদের নামে চাঁদাবাজি হয়েছে। কিন্তু এবারে তা নেই। তার দাবি, যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলো সবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আইন-শৃক্মখলা পরিস্থিতি আসলে ঠিকই আছে। (দৈনিক সংগ্রাম থেকে কিছু তথ্য নেয়া হয়েছে)




