তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আমরা মানি না; একান্ত সাক্ষাৎকারে এরশাদ
বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন। তার ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। রেডিও তেহরানের পক্ষ থেকে আমরা তাঁর কাছে ভারত সফরের নানা বিষয় এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছে। পাঠকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাতকারটি উপস্থাপন করা হলো।
রে. তে.: সম্প্রতি ভারত সফরে আপনি বলেছেন,“তিস্তার কত পানি পেলাম সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, একটি চুক্তি দরকার।” সেই সঙ্গে আপনি আরো বলেছেন, “ভারতের স্বার্থেই মহাজোট অটুট রাখা প্রয়োজন।” বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এ খবর ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে। আপনি কি মনে করেন যে,আসলেই তিস্তার পানি জরুরি নয় বরং একটি চুক্তি বেশি জরুরি?
এইচ এম এরশাদ: দেখুন, এ কথা যে বলবে সে তো উন্মাদ। যারা লিখেছে তারাও উন্মাদ। আমার ভারতের সফরের সময় তাদের প্রশ্ন ছিল আপনারা এখন তো অনেক পানি পাচ্ছেন। আমি তার জবাবে বলেছিলাম- হ্যাঁ, বর্ষাকালে তো পানি আসে। পানির সমস্যা হলো শীতকালে, শুষ্কমৌসুমে। তখন আমরা পানি পাই না। সেই সময় আমাদের পানির প্রয়োজন। আর সেই প্রসঙ্গে বলেছিলাম এখন বর্ষকালে পানি পাচ্ছি এ কথা ঠিক। কারণ বর্ষাকালে পানির তো অভাব নেই। তবে, এখন আমরা যতই পানি পাই না কেন শুষ্ক মৌসুমে যে পানির অভাব সে জন্যে আমাদের চুক্তির প্রয়োজন। একটা চুক্তি হলে মানুষ বুঝতে পারবে যে, আমরা প্রতিদিন বা প্রতিবছরে এতটা পরিমাণ পানি পাব। মানুষ তখন কিছুটা নিশ্চিন্ত হবে, শান্তিতে থাকতে পারবে। আর এটাই বড় কথা। তো সেখানে পানির কথাটা তুচ্ছ করে চুক্তির কথাটা বড় করে বলা হয়েছে; এটি ঠিক নয়।
রে. তে.:আপনি দিল্লি সফর শেষে বাংলাদেশে ফিরে বলেছেন,“এই সফরে বড় অর্জন হচ্ছে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একভাবে নির্বাচনের বিষয়ে সমর্থন পাওয়া।” তাহলে কি আপনি আগে ভারতের চাপে বা পরামর্শে মহাজোটে যোগ দিয়েছিলেন?
এইচ এম এরশাদ: দেখুন, আমার ভারত সফরে ওনাদের সাথে আমি আমাদের নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা করিনি। নির্বাচন আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে, যারা এ ধরনের প্রশ্ন তুলছে সেটা ঠিক নয়। ইট’স রং। ইট’স অ্যাবসলিউটলি রং। আই সেইড, আওয়ার পলিটিক্যাল প্রোব্লেম উইল সলভ। নো বডি এলস সাপোজ টু ইন্টারফেয়ার। এ ধরনের কোনো প্রশ্নই আসতে পারে না যে, উই টক উইথ দেম অ্যাবাউট ইলেকশান ইন বাংলাদেশ। আমি সেখানে সাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছি। ভবিষ্যতে কি হতে পারে, নির্বাচন হতে পারে কিনা -কি ধরনের সমস্যা এগুলো আমরা আলোচনা করেছি। কিন্তু আমাদের সমস্যার সমাধান আমরা নিজেরাই করব। আপনি অলরেডি এই প্রশ্নের মাধ্যমে আমাকে অভিযুক্ত করেছেন। আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন- সেখানে কি ঘটেছিল। আপনি আমাকে যেভাবে প্রশ্ন করেছেন তাতে রীতিমতো অভিযোগ করে বলেছেন- যে আমি এককভাবে নির্বাচন করব, ভারত আমাকে নির্বাচন করতে বলেছে- দিজ ইজ রং কোশ্চেন।
রে. তে.: আপনি বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন দীর্ঘ সময়। কিন্তু, রাজনীতির অঙ্গনে আপনাকে অনেকে আনপ্রেডিক্টেবল বলে মনে করেন। এ ধারণার কারণ হচ্ছে-আপনি বেশ কয়েকবার বিশেষ করে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে আপনি আপনার অবস্থান বদল করেছেন। আপনার মন্তব্য কি?
এইচ এম এরশাদ: দেখুন, আই অ্যাম নট আনপ্রেডিক্টেবল। একজন পলিটিক্যাল পার্সন ক্যান বি আনপ্রেডিক্টেবল, দ্যাটস ওকে। বাট ইন মাই কেস, ইট’স নট কারেক্ট। আমি আনপ্রেডিক্টেবল এমন কিছু করিনি।
জেলখানা থেকে আমি আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছিলাম। বিএনপি থেকে আমার কাছে অফার এসেছিল -সে অফার আমি গ্রহণ করিনি। আমি আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছিলাম এবং তারা সরকার গঠন করেছিলেন। কিন্তু, সরকার গঠন করার পর তারা আমার ওপর অনেক অবিচার করেছেন। আমার দল ভাঙার চেষ্টা করেছেন, পরবর্তী নির্বাচনে আমাকে অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। আর সেই জন্যে পরবর্তীকালে চেষ্টা করেছিলাম বিএনপি জোটের সঙ্গে যাওয়া যায় কিনা। সেজন্যে আমি বিএনপিকে কিছু শর্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু, সেসব শর্তের ক্ষেত্রে সমঝোতা বা বোঝাপড়া হয়নি বলে বিএনপি জোটের সঙ্গে যাইনি- আবার আওয়ামী লীগ জোটে ফিরে এসেছি। তবে, এখানে আনপ্রিডেক্টেবল বলে কোনো কথা নেই।
রে. তে.: আগামী জাতীয় নির্বাচনে কি আপনার দল মহাজোটভুক্ত থাকছে -নাকি এককভাবে নির্বাচন করবে?
এইচ এম এরশাদ: আমি গত তিন বছর ধরে বলে আসছি আমার দল এককভাবে নির্বাচন করবে এবং আমাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। আগামীতে আমরা এককভাবে নির্বাচন করব এটাই আমাদের দলের সিদ্ধান্ত। আর আমাদের সিদ্ধোন্তে অচল ও অটল থাকব।
রে. তে.:তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে আপনার অবস্থান কি? আপনি কি মনে করেন দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু,নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে?
এইচ এম এরশাদ: তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আমরা মানি না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক। অনির্বাচিত কতকগুলো মানুষ এসে সরকার পরিচালনা করবেন এবং নির্বাচনের পর আমরা আবার সরকার পরিচালনা করবো এটা ঠিক সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাদের ওপর অবিচার করেছে। তারা কখনও নিরপেক্ষ ছিল না। আর সেজন্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমরা মানি না এবং কোনো দিনই মানব না। তবে অন্যরা যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছেন তাদেরও দোষারোপ আমি করছি না। কারণ সব রাজনৈতিক দলের নিজস্ব আদর্শ আছে। এবং আদর্শ মোতাবেক রাজনৈতিক দলগুলো যে কোনো কিছু চাইতে পারে। আর আমিও চাচ্ছি তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেন না হয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নিয়ে যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় সেটাকে আমরা মেনে নেব।
রে. তে.: কিছু এজেন্ডা বা শর্তের ভিত্তিতেই তো রাজনৈতিক অঙ্গনে জোট হয়। তো যে চাওয়া পাওয়া বা শর্তের ভিত্তিতে মহাজোটভুক্ত হয়েছিলেন তা কতটা পূরণ হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
এইচ এম এরশাদ : দেখুন, আমরা করেছি নির্বাচনী জোট। নির্বাচন শেষ হয়েছে। এখনো আমরা মহাজোটে আছি। আগামীতে আমরা এককভাবে নির্বাচন করব- একথা বলেছি। তবে কি শর্ত ছিল, কি শর্ত ছিল না সেটা একান্ত ভেতরের কথা।
রে. তে.:মহাজোটের শাসনামলের এই চার বছরের দেশের নানা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের মধ্যে কিছু ক্ষোভ ও অসন্তোষ জমা হয়েছে এবং এটা হওয়াটও স্বাভাব্কি। সব চাওয়া পাওয়া পূরণ করা তো সম্ভব হয়ে ওঠে না। সরকারের বিরুদ্ধে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। তো মহাজোটের অন্যতম শরীক হিসেবে আপনার দলও কিন্তু সমালোচনার মুখে পড়ে, দায়-দায়িত্বও এড়াতে পারে না। এ সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?
এইচ এম এরশাদ: আমরা আসলে নির্বাচনী জোট করেছিলাম সে কথা একটু আগে আমি আপনাকে বলেছি। আমরা যদিও মহাজোটে আছি তবে এটা মূলত আওয়ামী লীগের সরকার। ফলে দায়-দায়িত্ব তাদের। কারণ, দেশ পরিচালনা আওয়ামী লীগই করছে ফলে ব্যর্থতা হলেও তাদের, সফলতাও তাদের। আমরা তাদের সঙ্গে আছি এটুকু শুধু বলা যাবে।
রে. তে.:আমরা সবশেষে জানতে চাইব- হলমার্ক কেলেঙ্কারি বা রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোসহ বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে যে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে এসেছে সে সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেছেন- চার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি তেমন কোনো কিছুই না। তার এ বক্তব্যকে আপনি কিভাবে দেখেন?
এইচ এম এরশাদ: না, তার এ বক্তব্য মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের এক টাকাও জনগণের সম্পত্তি। এটা কেউ তছরুপ করবে বা ভুয়া কাগজ দিয়ে নিয়ে যাবে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং কেউই এটা মেনে নেবে না। আমার মনে হয় অর্থমন্ত্রীর ওই বক্তব্য বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না এবং আমিও মানি না।



