রয়টার্সের রিপোর্ট: ‘আনরেস্ট থ্রেটেনস বাংলাদেশ’স কি গার্মেন্ট এক্সপোর্ট’

September 8, 2012 1:02 amViews:

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প দেশের অস্থিতিশীলতার কারণে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে বলে রয়টার্সের এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘আনরেস্ট থ্রেটেনস বাংলাদেশ’স কি গার্মেন্ট এক্সপোর্ট’ শিরোনামে ঢাকা থেকে রিপোর্টটি করেছেন সিরাজুল ইসলাম কাদির ও রুমা পাল। রিপোর্টে বলা হয়েছে, তৈরি খরচ কম থাকার কারণে বাংলাদেশের ১৯ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্ট শিল্প বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় পোশাক ব্র্যান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে অনেক খুচরা ব্যবসায়ী বলছেন, মজুরি নিয়ে অস্থিরতা এবং শিপিং বিলম্বিত হওয়ার কারণে এ সুযোগ আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একজন শ্রম আন্দোলনকারীকে হত্যা দেশের ৪৫০০ গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে অস্বাস্থ্যকর এবং অনিরাপদ কাজের পরিবেশের বিষয়টি প্রচার পাওয়ার কারণেও অনেক খুচরা ব্যবসায়ীকে তাদের সুনাম নিয়ে চিন্তিত করে তুলছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে বাংলাদেশের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে টেসকো, ওয়ালমার্ট, জেসি পেনি, এইচ অ্যান্ড এম, মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার, কোহল’স এবং কেয়ারফোরের মতো প্রখ্যাত ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি হয়ে থাকে। এসব ফ্যাক্টরিতে কর্মচারীদের মধ্যে কেউ কেউ প্রতি মাসে ৩৭ ডলারের মতো কম মজুরি পেয়ে থাকেন। জুন মাসে রাজধানী ঢাকার কাছে ৩০০টির বেশি ফ্যাক্টরি কর্মচারীদের নানা দাবিতে প্রায় এক সপ্তাহ বন্ধ ছিল। সরকার এবং ফ্যাক্টরির মালিকরা কর্মচারীদের দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেয়ার পর তারা আবার কাজে যোগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বড় একটি আন্তর্জাতিক হোলসেল কাস্টমারের একজন কান্ট্রি ম্যানেজার বলেছেন, তৈরি পোশাক শিল্পে অস্থিরতাই হচ্ছে আমাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা হিসাব করে দেখেছি দৈনিক ১৫ লাখ ইউনিট গার্মেন্ট পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০ লাখ ডলার। বাংলাদেশের রপ্তানির অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ বিলিয়ন ডলার। চীনের পর বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। দেশের ২৪ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক রপ্তানির ৮০ ভাগই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কনসালটেন্সি ফার্ম ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানি বলছে, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ গার্মেন্ট রপ্তানির পরিমাণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি করতে পারে। তবে এখানকার গার্মেন্ট কারখানার অবস্থার মান বেশ নিচে। শ্রমিকদের কম মজুরির পাশাপাশি এখানকার ফ্যাক্টরির কাজের পরিবেশ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবস্থাও করুণ বলে গার্মেন্ট শ্রমিক এবং বিশ্লেষকরা দাবি করেন। ঢাকার কাছে আশুলিয়ার এক গামের্নট কর্মী নাজমা বেগম বলেছেন, গার্মেন্ট শিল্পে অস্থিরতার মূল কারণ হচ্ছে নিম্ন মজুরি। এ দিয়ে কোন পরিবারের পক্ষে ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয় না।  নাজমা বলেন, আমি এখন মাসে ৪২০০ টাকা (৫১ ডলার) বেতন পাই। এটা বাড়িয়ে কমপক্ষে ৬০০০ টাকা করা উচিত। আমাকে বেতনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এক রুমের একটি বাসা ভাড়া বাবদ ব্যয় করতে হয়। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তো দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের বেতন যদি এ অনুযায়ী বাড়ানো না হয়, তাহলে অস্থিরতা আরও বাড়বে। ৩৫ বছর বয়সী আরেক গার্মেন্ট কর্মী সালমা বেগম জানালেন, তার তিন সন্তান রয়েছে। স্বামী একজন রিকশাচালক। দুজনে মিলে প্রতি মাসে আয় করেন প্রায় ৬৫০০ টাকা (৮০ ডলার)। এর পরেও তাদের বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ঋণ করতে হয়। বাংলাদেশের ৪০ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিকের মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছেন নারী। সপ্তাহের ছয় দিনই তাদের দৈনিক ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। কোন কোন ফ্যাক্টরি মালিক শ্রমিকদের বিক্ষোভ প্রতিহত করতে পেটোয়া বাহিনী পোষেণ। গত এপ্রিল মাসে শ্রম আন্দোলনকারী আমিনুল ইসলামকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। ওই ঘটনায় কেউই গ্রেপ্তার হয়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, এ হত্যাকাণ্ডে সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা রযেছে। কারণ এর আগে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে আমিনুল ইসলাম আটক এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। কর্মকর্তারা অবশ্য এ ধরনের দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামালউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কেউ যদি এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সরকারকে দোষারোপ করেন, তবে সেটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সরকার কেন এ ধরনের কাজ করবে? তবে আমরা বুঝতে পারছি এর সঙ্গে দায়ীদের না পাওয়া পর্যন্ত তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বলেছেন, আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড উদ্বিগ্ন হবার মতোই একটি ঘটনা। জুলাই মাসে তিনি বলেছিলেন অনেক কোম্পানির প্রতিনিধিই আমাকে এ ব্যাপারে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়নের বিষয়টি তাদের সুনামের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেছেন। তারা আমাকে বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে তারা আরও পণ্য নিতে চান, কিন্তু এসব কোম্পানি তাদের সুনামকে ঝুঁকিতে ফেলতে চান না। বাংলাদেশকে পণ্য ক্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ  বাজার উল্লেখ করে সুইডেনের হেনেস অ্যান্ড মাওরিটজ (এইচ অ্যান্ড এম) বলেছে, তারা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে বাংলাদেশের বাজার থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়ার ব্যাপারে সরাসরি কোন মন্তব্য করবে না। এইচ অ্যান্ডএম’র করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলি বিভাগের হেলেনা হেলমারসন এক ইমেইলে জানিয়েছেন, আমরা এ অস্থিরতার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি এবং গার্মেন্ট শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে কাজ অব্যাহত রেখেছি। আমরা মনে করি, ব্যবসা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে আমাদের উপস্থিতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হযেছে, তাদের প্রধান নির্বাহী কার্ল-জোহান পারসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গার্মেন্ট শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি বাড়ানোর আহবান জানিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের সমগ্র গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি প্রতি বছর পুনর্বিবেচনা করার জন্যও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন। পারসন পরে সাংবাদিকদের বলেছেন আমরা এমন একটি স্থিতিশীল মার্কেট দেখতে চাই, যেখানে মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা হবে এবং মালিকরা শ্রমিকদের যথার্থ মূল্যায়ন করবে। বাংলাদেশ থেকে এখনও কোন খুচরা বা পাইকারি কোম্পানি নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়নি। কেউ কেউ হয়তো এদিকে ঝুঁকছেন। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রিকারী বাংলাদেশ-কোরিয়ার যৌথ মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হাইয়ুন অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হো চো বলেছেন, আমরা কোন ধরনের সহিংসতা পছন্দ করি না। আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা চালিয়ে যেতে চাই। যখনই সহিংসতা হয়, তখনই ক্রেতারা আমাকে ফোন করেন। আমি তাদেরকে শান্ত করে বলি চিন্তা করবেন না নির্ধারিত সময়েই শিপমেন্ট করা হবে। এ কোম্পানির একজন কান্ট্রি ম্যানেজার বলেছেন আমরা যদি চীন বা শ্রীলংকাতে আমাদের অর্ডারগুলো সরিয়ে নিই, তাহলে আমাদের প্রতিটা ডেনিম প্যান্টের জন্য ২৫ সেন্ট করে বেশি গুনতে হবে। কিন্তু আমরা যদি বাংলাদেশের অস্থিরতার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করি তাহলে খরচ ২৫ সেটের বেশি পড়ে যায়। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের চেয়ে আমরা বিকল্পের কথাই বিবেচনা করব। ফ্যাক্টরির মালিক, সরকার এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো মিলেই গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন কাঠামো ঠিক করে। তবে অনেক ফ্যাক্টরিতেই এ বেতন কাঠামো অনুসরণ করা হয় না। এ বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহবান জানানো সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনার কোন আশু পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে শ্রমিকদের জন্য সরকার সুলভ মূল্যে পণ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করবে।

Rank