রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশ সরকারকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের অনুরোধ
নিউজ ডেস্ক: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক নয় জানিয়ে সফররত মার্কিন প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিতে সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের আশা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা স্বেচ্ছায়, নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাবে। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরজমিন দেখতে মিয়ানমার ঘুরে বাংলাদেশে আসা উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল সফরের সমাপনী লগ্নে গতকাল ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে এসব কথা বলেন। আমেরিকান সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের শরণার্থী ও অভিবাসনবিষয়ক উপ-সহকারী সচিব কেলি ক্লেমেন্টস, গণতন্ত্র, মানবাধিকারবিষয়ক উপ-সহকারী সচিব ড্যানিয়েল বায়ার এবং ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বক্তব্য রাখেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের পাঠানো উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য, বাংলাদেশের কক্সবাজার ও টেকনাফে রোহিঙ্গাদের যে অবস্থা দেখেছেন তার বর্ণনা দেন সংবাদ সম্মেলনে। জীবন রক্ষার তাগিদে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ আশ্রয় দেয়া উচিত অভিমত ব্যক্ত করে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জীবন চরমভাবে হুমকির মুখে। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা জানিয়ে কেলি ক্লেমেন্টস ও ড্যানিয়েল বায়ার বলেন, সেখানে নির্যাতন, উচ্ছেদ আর প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। সেখানে প্রাথমিক ও জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তা দেয়া দরকার। ক্যাম্পগুলোর অবস্থাও বর্ণনা করেন তারা। বলেন, ক্যাম্পে মানুষ গৃহহারা হচ্ছে। আর্থ-সামাজিকভাবে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাই সাহায্য সংস্থা, এনজিওসহ সবমহলের এগিয়ে আসা দরকার। কক্সবাজার ও টেকনাফে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পর্কে মধ্যমেয়াদি সুপারিশ দিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজিনা বলেন, দুই সরকার আলোচনা করছে। এটা খুব ভাল উদ্যোগ। তাই স্বেচ্ছায় নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চালানো দরকার। কারণ রাখাইন রাজ্যে মুসলিম ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর জীবন হুমকির মুখে। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। জাতিসংঘের সহায়তায় ও এনজিওদের উদ্যোগে তাদের সব সুবিধা দেয়া হচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসাবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও সুসম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার। তাহলে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে সদ্ভাব গড়ে উঠবে এবং এর ফলে উত্তেজনা, দাঙ্গা কমে আসবে। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বলেন, এখনও অস্থিরতা কাটেনি, পরিস্থিতি ঠিক হয়নি। আমরা অনেক জায়গায় ঘুরে দেখেছি, এটা খুবই আবেগপ্রবণ ও দুভার্গ্যজনক। ওই এলাকার মানুষ অনেক দুঃখে আছে, তাদের নিজ জায়গাতে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ওই প্রতিনিধি দল মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের কাছে রিপোর্ট করবে বলেও জানা গেছে।
একটি সুত্র জানায়, মিয়ানমারে জাতিগত সংঘাত এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধি দল। গতকাল সকালে টেকনাফ লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বস্তি পরিদর্শন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের শরণার্থী ও অভিবাসন ব্যুরোর উপসহকারী মন্ত্রী কেলি ক্লিমেন্টস একথা বলেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ দলের মিয়ানমারে প্রথম সফর। এ সফরকালে সিটিওয়ের পরিস্থিতি দেখে আমরা শঙ্কিত। মংডুতেও লোকজন সহিংসতার শিকার হয়েছে। তাদের নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন। মিয়ানমার সীমান্তমন্ত্রী আমাদের জানালেন, সেখানকার সরকারের জন্য সীমান্তের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ নিরাপত্তা বলতে এরা সিটওয়েসহ রাখাইন প্রদেশের জনগণের নিরাপত্তাকে বুঝিয়েছেন। সেখানকার যে সমস্যা সেটা সমাধানযোগ্য। এটা সমাধানে আমাদের কয়েকটি উপায় বের করে এগিয়ে যেতে হবে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমস্যা জর্জরিত এ দুই জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সবল নয়, উল্লেখ করে শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দেয়ায় জন্য ধন্যবাদ জানান। স্বল্প মেয়াদে মানব সহায়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়কে সামনে রেখে বিভিন্ন সংস্থাকে কাজের সুযোগ দেয়া সরকার বিবেচনায় রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেন।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা সাংবাদিকদের বলেন, আমরা প্রার্থনা করছি, রোহিঙ্গারা যাতে স্বাধীন ও নিরাপদভাবে তাদের দেশে ফিরতে পারে। ১০ বছর আগে এখানে অন্যান্য শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনে আমি যে সমস্যা দেখেছি এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বাংলাদেশে ৫৪৭টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ১১৬টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হবে। এ নিয়ে আমি গর্বিত।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে তিন দিন অবস্থান করে রাখাইন স্টেটের সিটওয়ে ও মংডু শহর ঘুরে আসেন। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে পৌঁছেন। ওইদিন ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলের দু’জন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ডেপুটি এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি) বুধবার কক্সবাজারে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প ও গতকাল টেকনাফ লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বস্তি পরিদর্শন করেন। এ সময় ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা ও জাতিসংঘ উদ্বাস্তু বিষয়ক হাই কমিশনের বাংলাদেশ প্রধান ক্রাইগ স্যান্ডার্সও ছিলেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কক্সবাজারস্থ শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক হাই কমিশনার ফিরোজ সালাহ্ উদ্দিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সৈয়দ নুরুল বাসির, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুর রউফ ও জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার, টেকনাফ ইউএনও মো. সামছুল ইসলাম মেহেদী, নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্প ইনচার্জ ড. কামরুজ্জামান, টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচাজ মো. মাহাবুবুল হক।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের শরণার্থী ও অভিবাসন ব্যুরোর উপসহকারী মন্ত্রী কেলি ক্লিমেন্টস এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম ব্যুরার উপসহকারী মন্ত্রী ডেনিয়েল বায়ের কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প ও টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা বস্তিতে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় ও সুযোগ সুবিধা নিয়ে কথা বলেন। লেদায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছলে রোহিঙ্গারা সারিবদ্ধভাবে বিভিন্ন স্লোগান ও দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে। প্রতিনিধি দল ক্যাম্পের মুসলিম এইড ইউকে পরিচালিত স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এদিকে বাংলাদেশে আসা অপর দু’ মন্ত্রী পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ব্যুরোর মুখ্য উপসহকারী মন্ত্রী জোসেফ উন এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া ব্যুরোর উপসহকারী মন্ত্রী আলিসা আয়ার্স কক্সবাজার সফরে আসেননি বলে জানা গেছে।




