শেয়ারবাজার কেলেংকারি: তদন্ত রিপোর্ট গায়েব

September 30, 2012 8:35 pmViews:

১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মূল তদন্ত রিপোর্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, এর সাথে প্রয়োজনীয় অনেক কাগজপত্রও গায়েব করে ফেলা হয়েছে। ফলে এই কেলেঙ্কারির মামলায় কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। এমনকি আলোচিত এ মামলায় সাক্ষীও পাওয়া যাচ্ছে না। যারা এক সময় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তারাও এখন আর সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হচ্ছেন না। এসব কথা আর কেউ বলেননি, বলেছেন স্বয়ং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসএইসি) চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন।

চলতি মাসের ১৮ তারিখে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত একটি সাব-কমিটির বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন বলে কমিটির সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিটির এই বৈঠকে যশোর-৫ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতান ও মহিলা আসন-২৩-এর সংসদ সদস্য আমিনা আহমেদও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে টিপু সুলতান শেয়ার মামলায় জড়িত কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের ‘জাতীয় দুর্বৃত্ত’ অভিহিত করেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, যেসব মামলায় হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে, তা ১৫ বছরেও কেন প্রত্যাহার হলো না। খান টিপু সুলতান ১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি মামলা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে বলেন এবং যেসব মামলার রায় হয়েছে তা দ্রুত বিচারিক আদালতে পাঠানোর কথা বলেছেন।

কমিটির সভায় এসইসির সদস্য যথাক্রমে প্রফেসর হেলাল উদ্দিন নিজামী ও মো: আবদুস সালাম সিকদার, এসইসির পরিচালক (আইন) মো: মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্মসচিব কামরুন নাহার আহমেদও উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন।

বৈঠকে এসইসির চেয়ারম্যান জানান, কমিশন দায়েরকৃত মামলার অগ্রগতি নিয়ে কাজ করছে। আইনের ফাঁক দিয়ে দোষী ব্যক্তিরা কোনোভাবেই যাতে রেহাই না পায়, সে বিষয়ে কমিশন তৎপর এবং পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনার জন্য কমিশন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে দেশের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে ১৫টি ফৌজদারি মামলা সিএমএম কোর্টে করা হয়; যার মধ্যে আটটি মামলা বিভিন্ন ইস্যুকারী কোম্পানি ও কোম্পানির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এবং সাতটি মামলা বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ, ডিলার ও ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে করা হয়।

তবে বৈঠকে এসইসির পক্ষ থেকে যেসব কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে, তা সন্তোষজনক নয় বলে মত প্রকাশ করেন খান টিপু সুলতান। এসইসির করা ১৫টি মামলার মধ্যে মাত্র তিনটি মামলার রায় হওয়া এবং দীর্ঘ দিন পরও ওই রায়ের কপি নিম্ন আদালতে না যাওয়ায় তিনি তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মামলাগুলো পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত আইনজীবীদের নাম-পরিচয় জানাতে বলেন। টিপু সুলতান ক্ষোভের সাথে বলেন, সরকারের ভাবমর্যাদা ুণœ করতে মামলার দীর্ঘসূত্রতার ব্যাপারে আইনজীবীদের ভূমিকা থাকতে পারে। তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেন, যে মামলাগুলোতে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে সেগুলোর স্থগিতাদেশ কেন ১৫ বছরেও প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়নি। টিপু সুলতান মামলাগুলোর বিষয়ে উপস্থাপিত প্রতিবেদন সম্পর্কে বলেন, প্রতিবেদন জবাবদিহিমূলক ও সুবিন্যস্ত আকারে কমিটি বা সংসদ সদস্যদের কাছে আসেনি। বিলম্বে প্রতিটি মামলার বিস্তারিত প্রতিবেদন কমিটিতে পাঠাতে হবে।

তা ছাড়া কোন তারিখে কোন মামলায় কোন আইনজীবী নিযুক্ত হয়েছিলেন তা কমিটির সদস্যদের জানা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ব্যাপারে এসইসির কর্মকর্তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেন তিনি। টিপু সুলতান শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলায় জড়িত কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের জাতীয় দুর্বৃত্ত হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, তাদের পক্ষে এ মামলার কাজে নিয়োজিত আইনজীবীকে ‘ওভার-পাওয়ার’ করা মোটেও কঠিন কাজ নয়। এসব প্রভাবশালী ব্যক্তি মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত করতে পারেন। তাই মামলা নিষ্পত্তিতে শুধু আইনজীবীদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে না দিয়ে এসইসির উদ্যোগে মামলার নিয়মিত তদারকি করা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। টিপু সুলতান, রিট পিটিশন, রিভিশন, রুল ইস্যু, স্থগিতাদেশ ইত্যাদি সমস্যা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মামলার গুরুত্ব সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপন করতে বলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে মামলাগুলো নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে বলেন এবং যেসব মামলার রায় হয়েছে সেগুলোর রায়ের কপি দ্রুত বিচারিক আদালতে পাঠানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সভায় এসইসির চেয়ারম্যান বলেন, এসইসির ‘রুলস-রেগুলেশনে’ অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি ছিল। যে কারণে ২০১০ সালে আবার শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি সম্ভব হয়েছে। বারবার যেন এ ঘটনা না ঘটতে পারে সেজন্য বর্তমান কমিশন ২৫টি রুলস-রেগুলেশন সংশোধন করেছে। তিনি আরো বলেন, বুকবিল্ডিং পদ্ধতির ফাঁকফোকর ব্যবহার করেও অনেক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে, তাই নতুন শেয়ার ইস্যুকারী কোম্পানির জন্য প্রচলিত আইন সংশোধন করতে হবে। বিদেশের শেয়ারবাজারের উদাহরণ টেনে এসইসির চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশের শেয়ারবাজারগুলোতে দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবে স্থিতিশীলতা এসেছে। সেখানে শেয়ারবাজারে কারসাজি ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সামান্যতেই আতঙ্ক ছড়িয়ে শেয়ারবাজারের সূচকে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটানো হয়। তিনি আরো উল্লেখ করেন, এসইসিতে জনবলের অভাবে অনেক ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। বর্তমানে এসইসির জন্য নতুন অর্গানোগ্রাম তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী নতুন জনবল নিয়োগ দেয়া সম্ভব হলে সব কিছু সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা সহজ হবে।

সাব কমিটির সভায় শেয়ারবাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর চারটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে দায়েরকৃত ১৫টি মামলার বিস্তারিত অগ্রগতি প্রতিবেদন আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কমিটিতে পেশ করা। কোন তারিখে কোন মামলায় কোন আইনজীবীকে নিযুক্ত করা হয়, তা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কমিটিকে অবহিত করা, দায়েরকৃত মামলাগুলো সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মাধ্যমে ৩০ দিনের মধ্যে শুনানির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া এবং যে মামলাগুলোর ইতোমধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে নিষ্পত্তিমূলক রায় হয়েছে তার কপি ৩০ দিনের মধ্যে রিচারিক আদালতে পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া। প্রতিবেদক: সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু (দৈনিক নয়াদিগন্ত)

Rank