মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীর দূর্ণীতি চরমে

May 15, 2012 5:41 pmViews:

এম শাহজাহান আহমদ, মৌলভীবাজার ঃ মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরী দূর্ণীতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে। দীর্ঘ ২০ বছরে চালু হয়েছে মাত্র ২৯টি শিল্প ইউনিট। অভিযোগ উঠেছে- ভারপ্রাপ্ত উপ-ব্যবস্থাপক এবং হিসাবরক্ষক, শিল্প উদ্দোক্তাদের সুযোগ-সুবিধাকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করতেই ব্যস্ত। ফলে, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসারে সরকারী উদ্যোগ সফল হতে না পারায়, কাংখিত রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ১৯ জন শিল্প উদ্দোক্তার অভিযোগ- ১৯৮৮ সাল থেকে এখানে কর্মরত শিল্পনগরী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম সরকার বছর দুয়েক যাবৎ ভারপ্রাপ্ত উপ-ব্যবস্থাপক পদে কর্মরত। তারই গ্রাম সম্পর্কে ভগ্নিপতি মুজিবুর রহমান ১৯৯০ সাল থেকে এখানে হিসাবরক্ষক পদে কর্মরত। সু-দীর্ঘদিন যাবৎ অবস্থান করায় এমনিতেই এখানে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যাপক আকার ধারন করেছে। সেইসাথে, প্লট বরাদ্দ কমিটি ও মূল্যায়ন কমিটির একাধিক সদস্যের নেপথ্য সমর্থন-সহযোগীতার কারণে তারা হয়ে উঠেছেন অপ্রতিরোধ্য। কায়েম করেছেন দূর্ণীতির রামরাজত্ব। জানা যায়- ১৯৮৭ সালে মৌলভীবাজার সদরের গোমড়া এলাকায় ১৪.৫৯ একর ভূমিতে ২ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে শুরু হয় এ শিল্পনগরী প্রকল্পের কার্যক্রম। ১৯৯২ সালে শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্লট বরাদ্দের শুরুতে মোট ১০১টি প্লটের মধ্যে ১০০টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয় ৬৫টি শিল্প ইউনিটের অনুকূলে। বাকী ১টি প্লট খালি ছিল। দীর্ঘ ২০ বছর পরও বর্তমানে মোট ১০১টি প্লটের মধ্যে ৯৬টি প্লট রয়েছে ৬৪টি শিল্প ইউনিটের অনুকুলে এবং বাকী ৫টি প্লট খালি পড়ে আছে। এ পর্যন্ত দীর্ঘদিন যাবৎ উৎপাদনযোগ্য ৩টি, দীর্ঘদিন যাবৎ নিষ্ক্রিয় ৭টি, নির্মাণাধীন ৭টি, সদ্য বরাদ্দকৃত ১৮টি এবং চালু হয়েছে মাত্র ২৯টি শিল্প ইউনিট। ১৯৯২ সাল থেকে এ প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ ১শ ৫০টি, বরাদ্দ বাতিল ৮৬টি এবং পুনঃবরাদ্দ ১৩/১৪টি। দীর্ঘ ২০ বছরে এ শিল্পনগরীর কোন শিল্প উদ্দোক্তাকে ঋন দেয়া হয়নি একটিও। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ১২ জন প্লটমালিক। জানা গেছে- প্রস্তাবিত শিল্প প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য, অবকাঠামোর তথ্য, নক্সা, লে-আউট প্ল্যান, ইত্যাদি সংযুক্ত আবেদনপত্র অনুমোদিত হলে, প্রতি ৩ মাস অন্তর অনুষ্ঠিত বরাদ্দ কমিটির সভার সিদ্ধান্তক্রমে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। এরপর চট্টগ্রামস্থিত আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগের জন্য বিসিক উপ-ব্যবস্থাপকের সুপারিশ প্রয়োজন হয়। অনুমোদন না হলে প্লট বরাদ্দ এবং সুপারিশ না হলে ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগ হয়না। নির্ধারিত ২ বছরের মধ্যে উৎপাদনে যেতে ব্যর্থ হলে প্লটের বরাদ্দ বাতিলের নিয়ম রয়েছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন শিল্প উদ্দোক্তা প্লটমালিক জানিয়েছেন- অনুমোদন ও সুপারিশ প্রাপ্তির জন্য ভারপ্রাপ্ত উপ-ব্যবস্থাপককে উৎকোচ না দিলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। কার্যক্রম শুরু না করলে প্লট বরাদ্দ বাতিল হবার ভয়ে উদ্দোক্তারা উৎকোচ প্রদানে বাধ্য হন। উৎকোচ লেনদেন ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেন হিসাবরক্ষক। বিনিময়ে দাতা ও গ্রহীতার কাছ থেকে আদায় করেন ‘বখশিস’। এসব অনিয়ম-দূর্ণীতির কারণেই স্থানীয় অনেক শিল্প উদ্দোক্তা এ শিল্পনগরীতে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছেননা। খাদ্য, রাসায়নিক, ইঞ্জিনিয়ারিং, অটো রাইসমিল, স’মিল ইত্যাদি ২৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও, গার্মেন্টস, টেক্সটাইলসহ প্রয়োজনীয় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছেনা। উৎকোচের কারণে কারো কারো বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লট খালি পড়ে থাকলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা, উৎপাদনযোগ্য ৩টি শিল্প ইউনিট উৎপাদনে না যাওয়া সত্তেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা, নির্মাণাধীন এবং নিষ্ক্রিয় আনিছা স্পাইসেস, ঢাকা মেটাল ওয়ার্কশপ, বাংলাদেশ শাহিন মেলামাইন, ফরিদ বিস্কুট এন্ড বেকারী, যমুনা প্লাস্টিক ইন্ডাষ্ট্রিক, শিউলী ষ্টীল, মেহেল গার্মেন্টস, জালালাবাদ গার্মেন্টস, ইউরো ফার্মাসিউটিক্যালর্স, স্টবেরী কনজুমারস্ প্রভৃতি শিল্প ইউনিটের বিরুদ্ধেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা। কোন কোন পুরাতন প্লটমালিকের প্লট বছরের পর বছর খালি পড়ে থাকলেও বাতিল করা হচ্ছেনা। আবার, কোন কোন নতুন প্লটমালিকের প্লট অনায়াসেই বাতিল করা হয়েছে। জানা গেছে- লিয়াকত অটো ইঞ্জিনিয়ারিং এর বি- ১নং প্লটটি ২ লাখ টাকা উৎকোচের বিনিময়ে গোপনে বাতিল করে অন্যজনের অনুকুলে পুনঃবরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে মৌলভীবাজারের যুগ্ন জেলা জজ ১ম আদালতে মামলা (নং- ৭৪/২০১১) বিচারাধীন রয়েছে। অবকাঠামোযুক্ত প্লট পুনঃবরাদ্দের পর সাবেক মালিক প্লটের মূল্য এবং অবকাঠামোর মূল্য ফেরত প্রাপ্তির জন্যও ভারপ্রাপ্ত উপ-ব্যবস্থাপককে উৎকোচ দিতে হয়। নতুবা, ঘুরতে হয় দিনের পর দিন। এসব কারণে কেউ কেউ বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লট ছেড়ে দিয়েছেন। আবার কারো কারো প্লট বাতিল হয়েছে। উৎপাদনে না আসা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও এসব কারণে উৎপাদনে যাচ্ছেনা। এ দুই কর্মকর্তার দূর্ণীতির কারণেই এ শিল্পনগরী দূর্ণীতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন বাতিলকৃত একাধিক প্লটমালিক। ভারপ্রাপ্ত উপ-ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম সরকার এবং হিসাবরক্ষক মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্ত হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে উল্লেখ করে ঐ একই সূত্র দাবী করেছে- উক্ত দুই কর্মকর্তার অনিয়ম-দূর্ণীতির কারণেই মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরী দীর্ঘ ২০ বছরেও পূর্ণাঙ্গ শিল্পনগরী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। তাই এ বিষয়ে সরকার আসু প্রদক্ষেপ না নিলে ধংস হয়ে যাবে এ শিল্প নগরী বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক।

Rank