পরাজয়ের বৃত্তে ঘুরছে মীরসরাই বিএনপি; ব্যর্থতার অঙ্গুলী প্রফেসর কামাল চৌধুরীর দিকে

March 15, 2012 8:01 pmViews:
Print Friendly and PDF

ইলিয়াছ রিপন, মীরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: পরাজয়ের বৃত্ত থেকে বেরুতে পারছে না মীরসরাই উপজেলা বিএনপি। ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে মহাবিপর্যয়ের পর সারা দেশে ঘুরে দাড়ালেও বিপরীত চিত্র চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার মীরসরাইয়ে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও মিলছে না জয়ের দেখা। দলীয় এবং জাতীয় কোনো কর্মসূচী ঠিকভাবে পালিত হয় না মীরসরাই। এমনকি চলো চলো ঢাকা চলো কর্মসূচীও দায়সারা ভাব। উপজেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে  দেয়া নেতৃত্বের কারণেই এমনটা ঘটেছে বলে মনে করছে সবাই। আর এক্ষেত্রে এককভাবে দায়ী করা হচ্ছে উত্তর জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরীকে। যদিও এ অভিযোগ মানতে নারাজ কামাল চৌধুরীর ঘনিষ্ঠরা। রাজনৈতিক মনোভাব না নিয়ে এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখায় এমনটা ঘটেছে বলে দাবী বিএনপি সমর্থকদের। সমাজসেবক থেকে এক পর্যায়ে বিএনপি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । কৌশল কিংবা ব্যক্তিগত সৌভাগ্য যেভাবেই হোক না কেন আগাগোড়া ভাগ্যের বরপুত্র হিসেবে আছেন তিনি।

গত সংসদ নির্বাচনে ড. এমরান চৌধুরী এর সাথে মনোনয়নযুদ্ধে নেমে তিনি মনোনয়ন পান। কিন্তু দুর্ভাগ্য জনক হলেও সত্য তিনি দলকে সেই রুপে সংগঠিত করতে পারেননি।সেই নির্বাচনে মূলধারার অগণিত নেতাকর্মীর অনাস্থার কারণেই পরাজয় ঘটেছে এমনটা ধারণা সবার।

উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাজী কাশেমকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন দেন। প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধরী। কিন্তু তার পক্ষে দলের অধিকাংশ কর্মী মাঠে নামেননি। বরঞ্চ গোপনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আলহাজ্জ্ব গিয়াস উদ্দিনের পক্ষে অনেকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনে হেরে যায় বিএনপি।

মীরসরাই ও বারইয়ারহাট পৌর নির্বাচনে কামাল চৌধুরীর মনোনীত প্রার্থী ফকির আহম্মদ ও মাঈন উদ্দিন লিটন একই ভাবে হেরে যান। অপরদিকে মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপির একাধিক নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটযুদ্ধে মাঠে নামেন। ফলে প্রতিদ্বন্দী আওয়ামীলীগের মনোনীত মীরসরাই পৌরসভায় প্রার্থী এম শাহজাহান ও বারইয়ারহাট পৌরসভায় আবু তাহের ভূঞা জয় লাভ করেন। পৌর নির্বাচনের পর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বচনেও ঘটে ধারাবাহিক বিপর্যয়। ১৫ ইউনিয়নে নির্বাচনে বিএনপির মাত্র দু’টি ইউনিয়নে জয়লাভ করে। আর এর জন্য বিএনপির অনেক নেতাকর্মীরাই সরাসরি দায়ী করেন প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরীকে। আর এসব কারণেই মীরসরাই উপজেলায় বর্তমানে বিএনপির এই বিপর্যস্ত দশা বলে অধিকাংশের ধারণা।

গত ২৫ জানুয়ারি বিএনপির চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি মীরসরাই উপজেলা বিএনপির উপজেলা ও দুই পৌরসভা কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়। বিএনপির গ্রুপির চরম আকারে ধারণ করেছে পরবর্তীকালে উপজেলা আহবায়ক কমিটি গঠন নিয়ে। একটি গ্রুপ উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতির সাক্ষর সম্বলিত আহবায়ক কমিটির বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সরবরাহ করে। অন্যদিকে আরেকটি গ্রুপ তোপের মুখে সে আহবায়ক কমিটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবাদ পাঠায়। কিন্তু  বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী কোনো আহবায়ক কমিটি গঠন করেননি বলে জানান। এ নিয়ে পুরো দলের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাক্ষর জাল করার অভিযোগ এনে সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন, জাসাসে উত্তর জেলা সাধারণ সম্পাদক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী সহ অধিকাংশ নেতাকর্মীরা কামাল উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রকাশে মিটিং মিছিল করে শাস্তির দাবী করেন। দলীয় কোন্দলের কারণে নেতাকর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। উপজেলা বিএনপির সাবেক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং সভাপতি নুরুল আমিন অন্য গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বর্তমানে মীরসরাই উপজেলা ও দুই পৌরসভায় বিএনপির কোনো কমিটি নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রবীণ রাজনীতি বিশ্লেষক বলেন, কামাল সাহেবের কাছে অর্থবিত্ত আছে, দানশীল হিসেবে উনার সুনাম আছে। কিন্তু রাজনীতির প্রজ্ঞায় তিনি দুর্বল।

বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেন  পরবর্তী সময়ে সবগুলো নির্বাচনে একের পর এক এভাবে ধারাবাহিক বিপর্যয়ের পরও কেন্দ্র যে কেন কামাল চৌধুরীকে এভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটাই এখন বিস্ময়। এ থেকেই বোঝা যায় যে তৃণমূলে তার অবস্থান আর জনসমর্থন কতটুকু? এর পরও যদি হাইকমান্ড কোন উদ্যোগ না নেয় তাহলে ভবিষ্যতেও ভরাডুবি ছাড়া আর কিছুই জুটবে না মীরসরাই উপজেলা বিএনপির ভাগ্যে। দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার কারণে যদি প্রতিবারই হারে তার প্রার্থী, তাহলে সহজেই ধরে নেয়া যায় যে তার বিরোধীরাই শক্তিশালী, তিনি নন।’  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক অনুসারী বিএনপি নেতা বলেন, ‘দলের ভেতরে থাকা বিশ্বাসঘাতকদের কারণেই এসব পরাজয়ের ঘটনা ঘটেছে। কামাল ঠেকাও মিশনের অংশ হিসেবে ষড়যন্ত্র করে একের পর এক ডেকে আনা হচ্ছে বিপর্যয়। এখনই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া না হলে দলের আরও বড় ক্ষতি হবে।’

জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও উত্তর জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী মীরসরাই বিএনপির
প্রেক্ষাপট নিয়ে বিডি২৪লাইভডটকমকে বলেন, ‘বিএনপি আর্দশের রাজনীতিতে বিশ্বাসী, এ দলে কোনো অন্তঃকোন্দল নেই। বিগত সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন প্রফেসর কামাল চৌধুরী। তাই মীরসরাই বিএনপির ভার উনার ওপর বর্তায়। বিগত কমিটি সঠিকভাবে গঠন করা হয়নি। সংঙ্গত কারণে যার বিরুপ সবকটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করে। এবারের আহবায়ক কমিটিও দলের ত্যাগী নেতাদেরকে বাদ দিয়ে গঠন করা হয়েছিল। সঠিকভাবে যদি কমিটি গঠন হয় তাহলে মীরসরাই বিএনপি জয়লাভ করবে।

উত্তর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ন সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নুরুল আমিন বিডি২৪লাইভডটকমকে বলেন, বিএনপিতে অন্তঃকোন্দল নেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের কারছুপির কারণে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, পৌর নির্বাচন এবং ইউপি নির্বাচনে আমরা হেরেছি।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন চেয়ারম্যান বিডি২৪লাইভডটকমকে বলেন, অবৈধ অণতান্ত্রিক উপায়ে কমিটি গঠন করার জন্যে কামাল সাহেবের বিরুদ্ধে আমাদের ক্ষোভ। যদি তিনি তৃনমূল পর্যায় হতে গণতান্ত্রিকভাবে প্রকাশ্যে কমিটি গঠন করেন তাহলে বিএনপি আরো চাঙ্গা হবে। তিনি আরো বলেন,  গত সংসদ নির্বাচনে কামাল সাহেব হারের প্রতিশোধটা নিজ দল থেকেই নিচ্ছেন। তারই ফলশ্রুতিতে তিনি সবকটি নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত একক ভাবে দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী বিডি২৪লাইভডটকমকে বলেন, গত স্থানীয় সরকার এবং পৌরসভা নির্বাচনে  সরকার দলীয় প্রার্থীরা জোরপূর্বক নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে জয়ী হয়েছে। যদি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হত তাহলে বিএনপির প্রার্থীরা ভাল ফলাফল করত।

বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠন নিয়ে  প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আবহায়ক কমিটি যথার্থ হয়েছে। এখানে কোনো অন্তঃকোন্দল নেই। ধানের মধ্যে কিছু ভূষি থাকে। বড় দলে দু’চারজনের ভিন্ন মত থাকতেই পারে। আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা এখনো বলার সময় হয় নি।

উপজেলার সব ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন বিএনপির নেতাকর্মীদের রেখে উপজেলা দলীয় কার্যালয়ে জেলা নেতৃবৃন্দ ও মীরসরাই বিএনপির অভিভাবক প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরীর উপস্থিতিতে আহ্বায়ক কমিটি করতে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দাবি। উপজেলা তৃণমূল পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতাকর্মী আগামী কমিটি গঠনের সময় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের জোর দাবি জানান।

Leave a Reply

You must be logged in to post a comment.

Leave a Reply

Rank