মীরসরাইয়ে জমির টপসয়েল বিক্রি রোধ করা যাচ্ছে না
মীরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে ফসলি জমির টপসয়েল কাটার হিড়িক পড়েছে। কোন ভাবে রোধ করা যাচ্ছেনা টপ সয়েল বিক্রি। জমির মালিকদের জিম্মি ও বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে টপসয়েল বিক্রি করা হচ্ছে। ফসলি জমির উপরি ভাগের মাটি বিক্রি করে দেয়ার ফলে ফসল উৎপাদ চরম ভাবে ব্যাহত হতে পারে। উপজেলার ইটভাটা গুলোতে বনের গাছ, পাহাড়ের মাটির পর এবার যাচ্ছে টপসয়েল (জমির উপরিভাগের মাটি)। এর আগে পাহাড়ি মাটি দিয়ে ইট তৈরির কাজ চলতো। এ মৌসুমে প্রায় চার কোটি ইট তৈরিতে ব্যবহৃত মাটির চাহিদা মেটাতে আবাদী জমিতে হাত দিয়েছে ইটভাটা কর্তৃপক্ষ। তবে মীরসরাইয়ের প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর আবাদি জমির কি পরিমাণ টপসয়েল ইটভাটায় যাচ্ছে এর কোন হিসেব নেই কৃষি অফিসে।
ইটভাটার প্রয়োজনে টপসয়েল বিকিকিনি প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উপজেলা কৃষি বিভাগ । সরেজমিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিম পাশে খইয়াছড়া ইউনিয়নের মসজিদিয়া, করেরহাট ইউনিয়নের অলিনগর, ঘেড়ামারা, মিরসরাই সদর ইউনিয়নের তারাকাটিয়িা, দূর্গাপুর ইউনিয়নের রায়পুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সামান্য অর্থের লোভে একরের পর একর জমির উপরি ভাগের মাটি কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন জমির মালিকরা। এক এক জমিকে একযোগে ১৮-২০ জন শ্রমিক মাটি কাটার কাজ করছে। পাশেই রয়েছে মাটি বহনের ট্রাক্টর। জমির প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট গভীর করে কাটা হচ্ছে মাটি। জমি থেকে ওই ইটভাটা দুটিতে গিয়ে দেখা গেছে, মাটিগুলো সেখানেই স্তুপ করে রাখা হচ্ছে।শ্রমিকরা জানান তারা প্রতিদিনই চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করেন। মাটি গুলো জমির মালিক থেকে ঠিকাদার (মাটির ক্রেতা) কিনে নিয়ে ইটভাটা, বাড়িঘর নির্মান কাজে বেশি ব্যবহার করা হয়।
রায়পুর এলাকার কৃষক আলতাফ হোসেন জানান, এর আগের মৌসুমেও অন্য একটি জমিতে টপসয়েল কেটে নেয়ায় এবার ফলন ভালো হয়নি। এ মৌসুমে যে গভীরতায় মাটি কাটা হচ্ছে তাতে পরবর্তী মৌসুমে সম্পূর্ণভাবে চাষের যোগ্যতা হারাবে জমিগুলো।
মীরসরাইয়ের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা শহীদ উদ্দিন জানান, মীরসরাইয়ে মোট ফসলী জমি রয়েছে ২৫ হাজার ৯১১ হেক্টর। এর মধ্যে এক ফসলী ৭ হাজার ১২৫ হেক্টর, দুই ফসলী ১৪ হাজার ১৭০ হেক্টর, তিন ফসলী ৪ হাজার ২১০ হেক্টর। বর্তমানে উপজেলার সর্বত্র আবাদী জমিগুলো থেকে ইটভাটার প্রয়োজনে টপসয়েল কেটে নেয়া হচ্ছে। ফলে পরবর্তী মৌসুমে টপসয়েলবিহীন জমিতে ফসল উৎপাদনে চরম বিপাকে পড়বে কৃষকরা। তিনি আরো বলেন নতুন নতুন বাড়িঘর, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মান করায় প্রতি বছর মিরসরাইয়ে ফসলী জমির পরিমান কমছে। তার উপর ফসলী জমির টপসয়েল বিক্রি উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলস উৎপাদন চারম ভাবে ব্যাহত হবে। আবাদি জমির মাটি বিক্রি বন্ধ করতে কোঠর আইন করে ব্যবস্থা নেয়া না হলে এটি রোধ করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মিরসরাই ইটভাটা মালিক সমিতির একটি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৪ টি ইটভাটায় প্রতি মৌসুমে গড়ে তিন কোটি ইট উৎপাদন হয়। প্রতি ২৫ ঘনফুট মাটি দিয়ে তৈরি হয় একটি ইট। বর্তমান সময়ে মিরসরাইয়ের ইটভাটা গুলোতে টপসয়েল দিয়ে মাটির জোগান দেয়া হচ্ছে।
মীরসরাইয়ের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আইয়ুব আলী জানান, জমির মূল উর্বরতা শক্তি থাকে মাটির উপরিভাগে। আর এ উর্বরতা শক্তি সঞ্চয় করতে সময় লাগে ৬-৭ বছর। দীর্ঘ সময় ধরে চাষাবাদের পর একটি জমি যখন উর্বরতা শক্তি ফিরে পায় তখন ওই জমির উপরি ভাগের মাটি বিক্রি করে দেয়া হলে ফসল উৎপাদন হ্রাস পায়। শুষ্ক মৌসুম শেষ হতেই শুরু হয় টপসয়েল বিকিকিনির মহোৎসব। দরিদ্র কৃষকদের অসচেতনতা আর দারিদ্রতাকে পুঁজি করে টপসয়েল কিনে নেয় ইটভাটা মালিক ও মাটি বিক্রির সাথে জড়িত বেকারেরা। তিনি আরো জানান, টপসয়েলের ৯ ইঞ্চি থেকে এক ফুট পর্যন্ত খাদ্যকণা থাকে। টপসয়েল কেটে ফেলার কারণে ফসল তার খাদ্য খুঁজে পায় না। সে কারণে ওই সব জমিতে ভালো ফলন হয় না। যে জমি থেকে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে শুধু ওই জমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হচ্ছেনা, মাটি ভর্তি ট্রাক যেসব জমির উপর দিয়ে যাচ্ছে সে জমি গুলোরও উর্বরা শক্তি নষ্ট হচ্ছে।




