ভবদহে আবার জলাবদ্ধতার আশঙ্কা!
ইয়ানুর রহমান, যশোর প্রতিনিধি: যশোরের ভবদহ এলাকায় পুনরায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছে স্থানীয় লোকজন। বিল কপালিয়ায় জোয়ারাধারের (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট, সংক্ষেপে টিআরএম) কাজের উদ্ধোধন করার পর থেকে একটি মহল টিআরএম করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বাঁধা দিচ্ছেন। তারা কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করছে এবং গত বুধবার এলাকার দুইজন জনপ্রতিনিধি’র কুশপুত্তলিকায় লাঠিপেটা করেন। অথচ বিল কপালিয়ায় টিআরএম বাস্তবায়ন না হলে আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই পলি জমে নদীর বুক উঁচু হয়ে যাবে এবং অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেবে। যদিও কৃষকরা বলছেন, তারা টাকা ঠিকমতো পাচ্ছেন ন।
জানা গেছে, লোনাপানি ঠেকিয়ে উপকূলীয় জলাভূমিকে সারা বছর কৃষিভূমিতে পরিণত করার জন্য ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এলাকার ৩৭টি পোল্ডার, এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ ও ২৮২টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। এরই অংশ হিসেবে যশোর ও খুলনা জেলার পাঁচটি উপজেলার সংযোগস্থল অভয়নগরের ভবদহে শ্রী নদীর ওপর নির্মিত হয় ভবদহ স্লুইসগেট। এলাকার ৫২টি বিলের পানি নিষ্কাষিত হতো এই স্লুইসগেট দিয়ে। প্রথম দশকে বোরো ধানের ব্যাপক ফলন হয়। আশির দশকের শুরুতে গেটের বাইরে পলি জমে বাঁধের বাইরের নদী অধিক উঁচু হয়ে যায়। এতে বাঁধের ভেতরে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। ১৯৮৪ সাল থেকে এই জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করে। পানিবন্দী হয়ে পড়ে অসংখ্য মানুষ। পানি সরানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু করে ভুক্তভোগী মানুষ। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার ২৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু করে খুলনা-যশোর নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প। ২০০২ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। শ্রী-হরি-টেকা নদীর পলি অপসারণ, খাল খনন ও বিল কেদারিয়ায় জোয়ারাধার নির্মাণ করা হয় এই প্রকল্পের আওতায়। ২০০৫ সালের অক্টোবরে টানা বর্ষণে পুনরায় পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এরপর ২০০৬ সালে চার দফা অতিবর্ষণে অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার দেড় শতাধিক গ্রাম তলিয়ে যায়। পানিবন্দী হয়ে পড়ে চার লক্ষাধিক মানুষ। পানি সরানোর দাবিতে ‘ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি’র নেতৃত্বে শুরু হয় অন্দোলন। তীব্র আন্দোলনের মুখে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ওই বছর শুরু হয় ৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্রী-হরি-টেকা নদী পুনর্খনন, পূর্ব বিল খুকশিয়ায় জোয়ারাধার চালু ও আমডাঙ্গা খাল সংস্কার।
পাউবো সূত্র জানায়, জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি বিলে ফেলে বিল উঁচু করার পাশাপাশি নদীর নাব্যতা বাড়ানোর লক্ষে ২০০৬ সালের ২৭ এপ্রিল তিন কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কেশবপুর উপজেলার পূর্ব বিল খুকশিয়ায় ৮৪৬ হেক্টর জমিতে তিন বছর মেয়াদি জোয়ারাধার চালু করা হয়। প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ডায়েরখালী ও গোসয়াল নামক স্থানে কেটে (কাটিং পয়েন্ট) বিলের সঙ্গে হরি নদীর সংযোগ দেওয়া হয়। প্রকল্প চলাকালে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় পাউবো। তিন বছর পর বিল কপালিয়ায় জোয়ারাধার চালুর সিন্ধান্ত নেয় পাউবো। কৃষকদের তিপূরণ পেতেও দেরি হয় সে সময়। ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়ার সময় নানাভাবে হয়রানি করা হয় সে সময় কৃষকদের। যদিও সেখানে জোয়ার আধার প্রকল্প চালু হওয়ায় কৃষকরা তার সুফল ভোগ করছেন। এখন বিল খুকশিয়ায় ব্যাপক পরিমান ফসল চাষ হচ্ছে।
গত ৫ মে বিল কপালিয়ায় জোয়ার আধার কাজের উদ্ধোধন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ অধ্য আব্দুল ওহাব। কিন্তু তার আগে থেকেই একটি স্বার্থন্বেষী মহল এই টিআরএমের বিরোধীতা করছে।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রভাবশালী একটি মহল, যারা জলাবদ্ধ এলাকায় মাছ চাষ করে, বড় বড় মৎস্য ঘেরের মালিক, তারা সাধারন কৃষকদের উস্কে দিয়ে ফায়দা হাসিল করছে।
গত ৫ মে টিআরএমের উদ্ধোধনের আগে থেকেই তারা কৃষকদের দিয়ে মিছিল, মিটিং করে। মনিরামপুরের নেহালপুরের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা নাজমুস সাদাত এবং তার লোকজন টিআরএমের উদ্ধোধনের ফলক ভেঙ্গে ফেলেন। ওই ঘটনায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বাদী হয়ে বিএনপি নেতা নাজমুস সাদাতসহ ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে গত ৬ মে থানায় একটি মামলা করেন। মূলত এরপর থেকে ওই এলাকার কৃষকরা ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন। যদিও গত মঙ্গলবার ওই মামলার আসামীরা আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। তারাই বুধবার হুইপ আব্দুল ওহাব এমপি এবং এ্যাডভোকেট খান টিপু সুলতান এমপি’র কুশপুত্তলিকায় লাঠিপেটা করেন। পাশাপাশি ওই দিন টিআরএমের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ভবদহের তিন নম্বর ভেন্টে সীমানা নির্ধারন করতে গেলে আন্দোলনকারীরা বাঁধা দেন। ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ফিরে আসেন।
এ ব্যাপারে হুইপ অধ্য আব্দুর ওহাব এমপি বলেন, টিআরএম প্রকল্প ছাড়া ভবদহ অঞ্চালের মানুষের বেঁচে থাকার আর কোন উপায় নেই। এ প্রকল্প বন্ধ হলে নদীতে পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাবে। একটি মহল কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে তার বিরোধীতা করছে।
জাতীয় সংসদের সদস্য খান টিপু সুলতান বলেন, যারা মানুষকে দুর্ভোগে ফেলে নিজেদের স্বার্থ হাছিল করতে চায় তারা কখনো জনগণের প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না। বিল কপালিয়ায় টিআরএম প্রকল্প চালু নিয়ে একটি রাজনৈতিক মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য জনগণকে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিল কপালিয়ায় টিআরএম প্রকল্প চালু করতে বর্তমান সরকার ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের শস্য ও মাছের ক্ষতিপূরণ বাবদ একর প্রতি বছরে ৪৮ হাজার টাকা প্রদান করছে। ইতিমধ্যে শতাধিক কৃষকদের মধ্যে প্রায় কোটি টাকা বিতরন করা হয়েছে। এ প্রকল্পের কৃষকদের তিপূরণ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি টাকা। কৃষকরা যাতে সহজ শর্তে তাদের তিপূরনের টাকা পেতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বর্গা চাষী ও অর্পিত সম্পত্তি মালিকদের মাঝে অচিরেই ক্ষতি পূরনের টাকা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ অধ্যক্ষ শেখ আব্দুল ওহাব ও সাংসদ খান টিপু সুলতান।
মনিরামপুরের কপালিয়া গ্রামের কৃষক পরিতোষ সরকার ও সুকুমার সরকার বলেন, ‘টিআরএম না হলে বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। আবার টিআরএম হলে না খেয়ে মরতি হবে। জমিতে ফসল হবে না। আগে ক্ষতিপূরণ দিতি হবে, না হলি টিআরএম করতি দেব না।’
যশোরে যারা জলাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করছেন, তাদের অন্যতম দাবি কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন সমন্বয় কমিটির আহবায়ক অনিল বিশ্বাস বলেন, ভবদহে জলাবদ্ধতা নিরশনের জন্য তারাই আগে আন্দোলন করেছেন এবং সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন টিআরএম করার জন্য। টিআরএম ছাড়া ভবদহে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির পথ নেই।




