মাগুরছড়া দিবস আজ; ক্ষতিপূরন আদায়ের বিষয়টি আজও অমীমাংশিত
এম শাহজাহান আহমদ, মৌলভীবাজারঃ আজ ১৪ জুন মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ১৫ বছর। ১৯৯৭ সনের এই দিনে কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া গ্যাস কূপে মার্কিন অক্সিডেন্টাল কোম্পানীর ড্রিলিং কাজ চলাকালে ভয়াবহ বিষ্ফোরণে রেলপথ, সড়কপথ, খাসিয়া পানজুম, বিদ্যুৎ লাইন, বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্যসহ ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। তৎকালীন সরকার উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজও জন সম্মূখে প্রকাশ না করায় কমলগঞ্জ উপজেলাবাসী তথা বৃহত্তর সিলেটবাসী আজও রহস্যের আগুনে পুড়ছে। অক্সিডেন্টাল কোম্পানী মাগুরছড়া গ্যাস ফিল্ডে স্মরণকালের ভয়াবহ এই বিস্ফোরনের পুরো ক্ষয়ক্ষতি পরিশোধ না করেই অপর মার্কিন কোম্পানী ইউনিকলের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে দেশ ত্যাগ করে। ইউনিকল কিছুদিন কাজ করার পর আরেক মার্কিন কোম্পানী শেভরনের কাছে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যায়। বর্তমানে গ্যাস উত্তোলনের কাজ করছে শেভরন বাংলাদেশ।
মাগুরছড়ার পাশেই নতুন করে মৌলভীবাজার গ্যাস ফিল্ডের ১৩ ও ১৪ নং ব্লকে ড্রিলিং শেষে কূপ খনন করে শেভরন। পরবর্তীতে ওই কুপ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও গুঞ্জণ রয়েছে এ বল্ক থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে কালাছড়ায় গ্যাস ও তেল উত্তোলনের সকল কাজক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। শেভরন এর দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গতকাল দুপুরে জানান,প্রচেচিং-এর মাধ্যমে আগামী মাসের প্রথম সাপ্তাহে এ বল্ক থেকে উত্তোলনকৃত গ্যাস ও তেল জাতীয় গ্রিট লাইনে নেওয়া হবে। কিন্তু ক্ষতিপূরন আদায়ের বিষয়টি আজও অমীমাংশিত রয়ে গেছেও শেভরনের কর্মকান্ড আজও চলমান। যার ফলে ক্ষতিপূরন আদায়ের বিষয়টি আজও অমীমাংশিত রয়ে গেছে। কোন সরকারই এ ক্ষতি আদায়ে যথাযথ উদ্যোগ না নিয়ে নিরব ভূমিকা পালন করছে।
কমলগঞ্জ উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লাউয়াছড়া ফরেষ্ট বিটের অভ্যন্তরে ও মাগুরছড়া এলাকায় ১৯৮৪-৮৬ ও ১৯৯৪ সালে সাইসলিক সার্ভেতে গ্যাস মওজুদের সন্ধান পায় যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক তেল গ্যাস উত্তোলনকারী অক্সিডেন্টাল কোম্পানী। এরই প্রেক্ষিতে উৎপাদন ভাগাভাগির চুক্তিতে ১৯৯৫ সালের ১১ জানুয়ারী মার্কিন বহুজাতিক তেল ও গ্যাস উত্তোলণকারী কোম্পানী অক্সিডেন্টালের সাথে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং গ্যাস উত্তোলনের জন্য ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমতি প্রদান করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর অক্সিডেন্টাল কোম্পানী মাগুরছড়ায় গ্যাস ফিল্ডের ড্রিলিং কাজের জন্য সাবলিজ প্রদান করেছিল ডিউটেক নামের জার্মান কোম্পানীর কাছে। গ্যাস উত্তোলনে ১৪ নং ব্ল¬¬কের মাগুরছড়াস্থ মৌলভীবাজার-১ গ্যাসকূপের খননকালে ৮৪০ মিটার গভীরে যেতেই ১৪ জুন মধ্য রাত সোয়া ১টায় ভয়াবহ বিষ্ফোরণ ঘটে। মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিষ্ফোরণে প্রত্যক্ষভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আখাউড়া-সিলেট রেল সেকশনের রেলপথ, কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়ক জনপথের প্রধান সড়ক, পিডিবির ৩৩ হাজার কেভি প্রধান বিদ্যূৎ লাইন, ফুলবাড়ি চা বাগান, মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির বাড়ি-ঘর, পান জুম এলাকা, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বন ও পরিবেশের জীববৈচিত্র্য। আর পরোক্ষভাবে ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হয় ২৮টি চা বাগান। দীর্ঘ ৬ মাস বন্ধ ছিল কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়ক ও আখাউড়া-সিলেট সরাসরি রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ ৩৩ হাজার কেভির ১৫ কিঃমিঃ বৈদ্যুতিক লাইন পুড়ে নষ্ট হওয়ার ফলে কুলাউড়া, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ উপজেলার ৫০টি চা বাগানে দীর্ঘদিন স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়। ৬৯৫ হেক্টর বনাঞ্চলের বৃক্ষ সম্পদ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। এছাড়া ২০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়, যার তৎকালিন বাজার মূল্য ছিল ৫০ কোটি ডলার।
মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বি¯েফারণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়। মাগুরছড়ায় গ্যাসকূপ বি¯েফারণের পর সরকারের গঠিত সর্বশেষ তদন্ত কমিটি শুধু গ্যাসের ক্ষতি বাবদ ৬০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ক্ষতিপূরন আদায়ের বিষয়টি আজও অমীমাংশিত রয়ে গেছে।
ভয়াবহ আগুনে পোড়া সেই স্থানে এখন সবুজের সমাহার। এ সবুজের মধ্যেই মূল কূপ স্থলটি এখনও পুকুরের মত ধারণ করে টিকে আছে। চর্তুদিকে কাটা তারের বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনি তৈরী করা হয়েছে। টিলার উপর সবুজ বনায়নের মাঝে মাঝে আগুনের পুড়া মাথা ভাঙ্গা ডাল-পালা বিহীন কালো রঙের গাছ গুলো দুর্ঘটনার নিরব স্বাক্ষী হয়ে এখনও দাড়িয়ে আছে। প্রতিবছর জুন মাস এলে বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় তোলপাড় হয় ঠিকই। কিন্ত আজও ক্ষতি পূরন আদায় হয়নি। ১৯৯৭ থেকে ২০০৯ সময়কালে বিগত দলীয় সরকারসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার মাগুরছড়ার গ্যাসস¤পদ, পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মার্কিন কো¤পানি অক্সিডেন্টাল-ইউনোকল- শেভরনের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি। এমনকি বর্তমান সরকারের ৩ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও এই ক্ষতি পূরন আদায়ে তেমন অগ্রগতি নেই বললেই চলে। আজ বুধবার দুপুরে মাগুরছড়ায় ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবীতে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধান মন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। মাগুরছড়ায় ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটির সম্পাদক সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের মাগুরছড়ায় গ্যাসকূপ বি¯েফারণের পর সরকারের গঠিত সর্বশেষ তদন্ত কমিটি শুধু গ্যাসের ক্ষতি বাবদ ৬০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছিল। এ ছাড়া তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি ও বিশেষজ্ঞ মহল বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী গ্যাস ও পরিবেশগত ক্ষতিবাবদ ১৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেন। এ ক্ষতিপূরণের টাকা এখনো মেলেনি। এদিকে দিবসটি স্মরণে পরিবেশবাদীসহ বিভিন্ন সংগঠন আগামীকাল বৃহস্পতিবার কমলগঞ্জের মাগুরছড়ায় মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করবে।




