দোয়া করেন মৃত্যুটা যেন কষ্টের না হয়

১৬ জুন, ২০১৭ ০৩:৪৯:০১

‘আগুন আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আমরা সবাই এখন বাথরুমে। আমাদের বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। আমাদের জন্য দোয়া করেন মৃত্যুটা যেন কষ্টের না হয়।’ লন্ডনে থাকা চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে মৃত্যুর মুখে দাড়িয়ে মুঠোফোনে সর্বশেষ এ কথাই বলেছিলেন কমর উদ্দিনের ছোট মেয়ে হুছনা আক্তার তানিয়া। বুধবার লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত হয়েছেন মৌলভীবাজারের এই পরিবারের ৫ সদস্য। তাদের বাড়ি সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের খৈসাউড়া গ্রামে।

কথা হয় তাদের গ্রামের বাড়িতে থাকা স্বজনদের সঙ্গে। তারা জানালেন- অগ্নিকাণ্ডের প্রথমদিকে মুঠোফোনে সেদেশে তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাঁচার আকুতি জানালেও এখন মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এ থেকে তাদের ধারণা ওই ভবনের ১৭ ও ১৮ তলার ফ্ল্যাটে থাকা তাদের পরিবারের ৫ সদস্যই নিহত হয়েছেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা তাদের লাশ উদ্ধার করেন। হুছনা আক্তার তানিয়ার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল জুলাইয়ের ২৯ তারিখে। সব প্রস্তুতিও সমপন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু তার আগেই এই ট্রাজেডি।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই স্বজনদের মধ্যে চলছে আহাজারি আর শোকের মাতম। প্রায় ৫০ বছর ধরে কমর উদ্দিন লন্ডনে বসবাস করছেন। নিখোঁজ থাকা কমর উদ্দিন কমরু মিয়ার (৯৬) দুই স্ত্রী, ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ে। তার ২য় স্ত্রী রাবেয়া বেগম ও ২ ছেলে আব্দুল হামিদ (৩৩), আব্দুল হানিফ (২৭), ছোট মেয়ে হুছনা আক্তার তানিয়া (২৪)কে নিয়ে থাকতেন লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারে। ২য় স্ত্রীর গর্ভের বড় ছেলে আব্দুল হাকিম বছরখানেক আগে বিয়ে করায় নববধূকে নিয়ে অন্য একটি বাসায় থাকেন। তাই ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

আর দেশের গ্রামের বাড়িতে তার ১ম স্ত্রী জুলেখা খাতুনকে নিয়ে থাকেন বড় ছেলে সুজন মিয়া ও তার পরিবার। কমর উদ্দিনের ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে ৪ জনের বিয়ে হলেও অবিবাহিত ছিলেন ৩ জন। এর মধ্যে ছোট মেয়ে মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া হুছনা আক্তার তানিয়ার বিয়ের দিন ধার্য ছিল ২৯শে জুলাই। বর থাকে লন্ডনেই। বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা লন্ডনেই। এ নিয়ে চলছিল প্রস্তুতি। বিয়েতে দু’দেশের স্বজনদের মধ্যে আনন্দ উৎসবেরও কমতি ছিল না। বিয়ে উপলক্ষে দেশের বাড়িতেও চলছিল সংস্কার কাজ। কমর উদ্দিন সর্বশেষ মুঠোফোনে ঈদের পরে বাড়িতে আসবেন বলে জানিয়েছিলেন ছেলে সুজনকে। বাড়ি সাজাতে দিয়েছিলেন নানা দিকনির্দেশনাও। এখন এসব কথাই যেন স্মৃতি। এই কথাগুলো স্মরণ করে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন দেশে থাকা স্বজনরা।

তাদের শোকে শোকাতুর প্রবাসী অধ্যুষিত এ জেলার লোকজনও। গেল বছর চৈত্র মাসে বাড়িতে আসলেও আর আসা হয়নি কমর উদ্দিনের। এ বছর স্বপরিবারে জামাই ও মেজো ছেলের পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে দেশে আসার কথা ছিল তার। লন্ডনের অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ৫ জন নিখোঁজের খবর চাউর হলে পুরো জেলাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। এলাকার লোকজন ওই শোকগ্রস্ত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে যাচ্ছেন। পুরো গ্রামজুড়ে শোক।

দেশে থাকা কমর উদ্দিনের বড় ছেলে সুজন মিয়া ও বড় মেয়ের ছেলে সরকারি কলেজের ইংরেজি অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্র মো. আকবর আলী জানান, তারা বুধবার ভোরেই তাদের চাচাত ভাই ও মামা লন্ডনপ্রবাসী আব্দুর রহিম মুঠোফোনে এই খবর পান। আব্দুর রহিম তাদের জানান তানিয়া তাকে ফোন দিয়ে তাদের অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছিলেন। তাই বাড়িতে ইমাম সাবদের দিয়ে দোয়া করাতে বলেন। বাড়ির সদস্যরা তাই করেন।

সেই থেকে শুরু হওয়া আহাজারি এখনো থামছে না ওই পরিবারে। দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরা বলেন, আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছি, স্বজনদের লাশ যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়। সূত্র-মা,জ,অ

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: