প্রচ্ছদ / Special Event / বিস্তারিত

ভারত–পাকিস্তান ‘স্বপ্নের’ ফাইনাল আজ

১৮ জুন, ২০১৭ ০৮:৩৭:২২

কাল দুপুর বারোটার দিকে ওভালের হবস গেটের সামনে ছোট্ট একটা জটলা। মাঝখানে তাঁরা দুজন। সাদা দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ এবং মাথার পেছনে টিকিওয়ালা এক তরুণ। টেলিভিশনের পর্দায় অসংখ্যবার আপনি এঁদের ভেসে উঠতে দেখেছেন। একজন তিন দশকেরও বেশি পাকিস্তান সমর্থকের ‘মুখ’। গ্যালারিতে পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে নেচে বেড়ান। নাম সুফি আবদুল জলিল। অন্যজন শচীন টেন্ডুলকারের সবচেয়ে একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে স্বীকৃত। ভারতের সব ম্যাচে ভারতীয় পতাকার রঙে শরীর রাঙিয়ে পতাকা ওড়ান আর শঙ্খ বাজান। নাম সুধীর গৌতম। খবর-প্রথম আলো

দুই দেশের দুই বিখ্যাত সমর্থকের বন্ধুর মতো পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গল্প করার ওই দৃশ্যটা পরদিন ভারত-পাকিস্তান ফাইনালের প্রতীকী চিত্র হয়ে দেখা দিল। দুই দেশ হয়তো, হয়তো কেন, নিশ্চয়ই উত্তেজনায় কাঁপছে। কিন্তু এই লন্ডনে ফাইনালের আগের দিনের ওভালে সেটি বোঝার কোনো উপায়ই নেই। উপমহাদেশের সঙ্গে চরিত্রগত এই একটা বড় পার্থক্য এসব দেশে এলে খুব চোখে পড়ে। রাস্তাঘাটে, হোটেল লবিতে, টিউবে কোথাও বোঝার উপায় নেই যে এত বড় একটা ম্যাচের ক্ষণ গণনা চলছে।

কত বড় ম্যাচ? সেটি আইসিসি কর্তাদের হাসি হাসি মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে। অনেক দিন ধরেই বাতাসে একটা কথা ওড়ে, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত ও পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রেখে তারপরই ফিকশ্চার করতে বসে আইসিসি। সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়া টেলিভিশনের সঙ্গে এ নাকি অলিখিত এক চুক্তি। ভারত-পাকিস্তান একটা ম্যাচের নিশ্চয়তা মানেই যে কোষাগার ফুলে-ফেঁপে ওঠা। সেখানে এক টুর্নামেন্টে দু-দুটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। তার একটি আবার ফাইনাল। এ যেন লটারি জেতার মতো ব্যাপার!

তা এই টুর্নামেন্টের সম্প্রচার স্বত্ব যাদের, সেই স্টার স্পোর্টস তো ‘লটারি’ই জিতেছে। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী ফাইনালে ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের রেট দশ গুণ বেড়ে এক কোটি রুপি হয়ে গেছে! যদিও দুই দলের দ্বৈরথের সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে একটু বিস্ময়ই জাগবে, এ নিয়ে এত হইচইয়ের কী আছে? এ তো একেবারেই একপেশে এক লড়াই। আইসিসি টুর্নামেন্টে সর্বশেষ সাত ম্যাচের সাতটিই জিতেছে ভারত। তা অবশ্য জিততেই পারে। বিশ্বকাপে তো ভারতের সঙ্গে কখনোই পারে না পাকিস্তান। তা সেটি ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ হোক বা ২০ ওভারের। কিন্তু সব মিলিয়েও তো সর্বশেষ পাঁচ ওয়ানডের চারটিতেই ভারতের জয়। এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেই দেখা হয়েছে দুই দলের। এজবাস্টনের ওই ম্যাচেও খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে পাকিস্তান। ফাইনালে কারা জিতবে, সেটি তো তাহলে বোঝাই যাচ্ছে!

সেই ‘বোঝা’টাকেই সত্যি বলে ধরে নেওয়া যেত, যদি এটি ভারত-পাকিস্তান না হতো! এমনিতেই এটি আর দশটা ম্যাচের মতো নয়, তার ওপর ফাইনাল। তার ওপর পাকিস্তান ক্রিকেট এই টুর্নামেন্টে আবার তার অননুমেয় চরিত্র নিয়ে দেখা দিয়েছে। সুযোগ মিলেছে র‍্যাঙ্কিংয়ের আট নম্বর দল হিসেবে। ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে এমন খেলেছে, যেন র‍্যাঙ্কিংয়ের যথার্থতা প্রমাণ করার একটা দায় ছিল। সেই ম্যাচের পর একে একে দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে অতীতের তুলনায় একেবারেই তারকাদ্যুতিহীন এই পাকিস্তানই উঠে গেছে ফাইনালে।

বিরাট কোহলি কাল সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘কোনো দল খুব ভালো শুরু করে আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যায়। আবার কোনো দল বাজে শুরু করে আস্তে আস্তে উজ্জ্বল হতে থাকে।’ পাকিস্তান এখানে কোন দলে, সেটি তো আর বলার প্রয়োজন পড়ছে না। গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের তাই কোনো তাৎপর্যই দেখছেন না কোহলি। নতুন দিন, নতুন ম্যাচ এবং ৪ জুন এজবাস্টনের তুলনায় ১৮ জুন ওভালের পাকিস্তানও ‘নতুন’।

আমির সোহেল পাকিস্তানের ফাইনালে ওঠায় ‘বাইরের প্রভাব’ দেখছেন আর মাইক হাসি পড়ছেন নিয়তির লেখা অদৃশ্য পাণ্ডুলিপি। আইসিসির ওয়েবসাইটে কলাম লিখেছেন সাবেক অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যান। পাকিস্তানের অগ্রযাত্রায় নিয়তি প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন সেখানেই। হাসির কথায় অনেকের মনে পড়ে যাচ্ছে, এই ইংল্যান্ডেই ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। সেবারও টুর্নামেন্ট শুরুর আগে পাকিস্তানকে কেউ গোনায়ই ধরেনি। সেই পাকিস্তানই সবাইকে অবাক করে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়।

এসব কথাবার্তা হওয়ার কারণ একটাই, বিরাট কোহলির এই ভারতের সঙ্গে সরফরাজ আহমেদের এই পাকিস্তানের কোনো তুলনাই চলে না। কাগজে-কলমে শক্তি, অভিজ্ঞতা, দুই দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস-সব কিছুই বলছে, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ভারতের কাছে ছিল, ভারতের কাছেই থাকবে। দাঁড়ান, দাঁড়ান; ব্যাপারটা যদি এতই সরল হতো, তাহলে আর ফাইনাল খেলার কী দরকার! এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেই, এই ওভালেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভারতের ম্যাচটি মনে নেই?

তা আজকের ফাইনালের নির্ধারক হতে পারে কী? অতীতেও ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ যেমন ‘ভারতীয় ব্যাটিং বনাম পাকিস্তানি বোলিং’হয়ে ছিল, এই ফাইনালও তা-ই। টুর্নামেন্টে ভারতের ব্যাটিং গড় ৯১.৫। সেটির এমনই দাপট যে যুবরাজ-ধোনির মতো ব্যাটসম্যানরা কিছু করারই সুযোগ পাচ্ছেন না। যা করার প্রথম তিন ব্যাটসম্যানই করে দিচ্ছেন। শিখর ধাওয়ানের রান টুর্নামেন্ট-সর্বোচ্চ ৩১৭, রোহিত শর্মার ৩০৪, বিরাট কোহলির ২৫৩। দুই ওপেনার মিলেই বলতে গেলে খেলা শেষ করে দিয়ে আসছেন। আর কোহলি তো ব্যাটিং থেকে অনিশ্চয়তা ব্যাপারটাই মুছে দিতে বসেছেন।

এই ব্যাটিংই পাকিস্তানের বড় দুশ্চিন্তা। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মামুলি একটা রান তাড়া করতে গিয়েই নাভিশ্বাস উঠেছে। শ্রীলঙ্কানরা পাল্লা দিয়ে ক্যাচ না ফেললে সরফরাজেরও সাধ্য ছিল না ওই ম্যাচ জেতানোর। সরফরাজের সঙ্গে যিনি ওই দিন ‘ব্যাটসম্যান’ হয়ে গিয়েছিলেন, সেই মোহাম্মদ আমির চোট কাটিয়ে ফিরছেন আজ। আমিরের সঙ্গে জুনাইদ আর হাসান আলী-এই পেস ত্রিফলাই পাকিস্তানকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে সব পূর্বানুমান মিথ্যা প্রমাণ করার। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি উইকেট (২৮) নিয়েছেন পাকিস্তানি বোলাররাই।

তাহলে আজকের ফাইনাল নিয়ে শেষ কথা কী? ‘ভারতীয় ব্যাটিং বনাম পাকিস্তানি বোলিং’ ব্যাপারটা যেমন বদলায়নি, তেমনি বদলায়নি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে চির অনিশ্চয়তাও। তা সাম্প্রতিক ইতিহাস যতই অন্য কথা বলুক না কেন!

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: