আরেফিন সোহাগ

লেখক ও সাংবাদিক

দেশে চলছে সিনেমা স্টাইলে ধর্ষণ!

০৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১১:৪৩:১৬

বাংলাদেশ। একটি স্বাধীন দেশ। ৩০ লক্ষ শহীদের বুকের রক্তের বিনিময় অর্জিত এই দেশ। আর আজ এই স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে চলতে পারছেন না নারীরা। প্রতিদিন ধর্ষণের শিরোনাম হচ্ছেন নারীরা। ৬ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধাও রেহাই পাচ্ছেন না ধর্ষণের হাত থেকে। নিজের জন্মদাতা পিতা, সৎ পিতা, শিক্ষক, নিকটাত্মীয় কারো হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না ভিকটিমরা। কর্মক্ষেত্রে, চলন্ত বাসে, এমনকি নিজের ঘরে পর্যন্ত নেই নিরাপত্তা। এ যেন এক অন্তবিহীন ঘূর্ণিঝড়ের করাল থাবা। এ যেন সিনেমার কায়দায় ধর্ষণ!

মায়ের সামনে থেকে মেয়েকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ, রাস্তায় ফেরার সময় তুলে নিয়ে ধর্ষণ, রাতে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে ধর্ষণ, প্রেমের নামে ধর্ষণ, বন্ধুরা মিলে কিশোরীকে ধর্ষণ, চাকুরি দেওয়ার নামে ধর্ষণ, আপন লোকদের কাছে ধর্ষণসহ অনেক ধরণের খবর প্রতিদিন প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু কেন? এর কি শেষ নাই? এমন ঘটনাতো সিনেমাকেও হার মানাই।

একজন নারীর কাছে নিজের ইজ্জত সব থেকে বেশি মূল্যবান। আর সেই মূল্যবান জিনিষটাও যদি জোর করে কেউ কেড়ে নেয় সেখানে আর কি বা থাকে? আমরা যখন শুনি অমুক নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে তখন মনে হয় ধর্ষণ কি আমাদের সমাজের একটা চলমান কার্যক্রম হয়ে গেছে? আর কত ধর্ষণের খবর পড়তে হবে দেশ পরিচালনাকারীরা বলতে পারেন?

একটু ভেবে দেখা যাক, একটা নারী যখন বেড়ে উঠে তার প্রতি আমাদের সবার একটা দায়িত্ব থাকে। সে কি করছে কোথায় যাচ্ছে। কাদের সাথে মিশছে। আমরা কি সেই খবর নিচ্ছি? যদি উত্তর না হয়, তাহলে ওই নারীর সর্বনাশের জন্য দায়ী কে? হয়তো আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পাবো না। কিন্তু এটা সত্য যে অধিক মেলামেশা আর অচেনা কাউকে বিশ্বাস করার কারণেই এই ধর্ষণের মতো নোংরা কর্মকান্ড ঘটছে।

আমরা যদি একটু চিন্তা করে দেখি যে, কোন নারী কি ইচ্ছাকৃত ভাবে ধর্ষিত হতে চায়? যদি উত্তর না হয় তাহলে কেন সেই ধর্ষিতাকে আমরা দোষারোপ করব? আমাদের সমাজ কেন একটা নারীর নিরাপত্তা দিতে পারছে না? আমাদের ব্যর্থতা কোথায়?

অতৃপ্ত যৌন আকাঙ্খা, দেয়ালে নগ্ন পোস্টার, যৌন উত্তেজক অবৈধ বইয়ের রমরমা ব্যবসা, অশ্লীল পত্রপত্রিকা, অশ্লীল ছায়াছবি প্রদর্শন, ব্লু-ফিল্ম, পর্নোগ্রাফি, চলচ্চিত্রে নারীকে ধর্ষণের দৃশ্যের মাধ্যমে সমাজে রাস্তাঘাটে বাস্তবে ধর্ষণ করার উৎসাহ যোগান, নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার, ইন্টারনেটে অশ্লীল সাইটগুলো উম্মুক্ত করে দেয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, ১৮ প্লাস চ্যানেলে নীল ছবি প্রদর্শন, যৌন উত্তেজক মাদক ইয়াবার বহুল প্রসার ইত্যাদি কারণে দিন দিন ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বেড়েই চলেছে ধর্ষণ। শুধু ধর্ষণ করে থেমে যাচ্ছে না ধর্ষকেরা সেই সাথে ভিডিও করছে অশ্লীল এই কর্মকান্ডের। কিন্তু কেন? প্রতিদিন ধর্ষণের খবর পড়তে পড়তে আর ভালো লাগছে না। নারী নির্যাতনের নেপথ্য কারণ কী এই প্রশ্নের জবাবে নারী পুরুষ একে অপরকে দোষারোপ করতে দেখা যায়। পুরুষ পক্ষ বলছে, নারীর উগ্র চলাফেরা, নগ্নতা, মিডিয়ায় তাদের আবেদনময়ী হয়ে উপস্থাপন পুরুষকে ধর্ষণের দিকে উদ্বুদ্ধ করছে। আর এই কারনে নারী দিন দিন নারীত্ব সংকটে পড়ছে। এর শেষ কোথায়?

রাজধানীসহ সারা দেশেই নারী নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে। অপহরণের পর নারীদের ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। বিশেষজ্ঞদের এসব পরিসংখ্যান ও মন্তব্যের পাশাপাশি গত বেশ কিছুদিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণেও দেখা যায়, রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণপ্রবণতা মারাত্মক রূপ নিয়েছে।

তাই এই ধর্ষণকে বন্ধ করতে হলে একমাত্র উপায় নিজেকে শক্ত করা। আর কোন ধর্ষক যেন ঝাপিয়ে পড়তে না পারে ধর্ষণের জন্য। আসুন আমরা আমাদের সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলি। তাদের মনের কথা গুলো বোঝার চেষ্টা করি। পরিবারের নজর সন্তানের উপর কঠোর ভাবে থাকলে দূর্ঘটনা কমতে পারে।

আমাদের সমাজে এমন ঘটনা নিত্যদিন ঘটেই চলছে। এর কি প্রতিকার হবে না? নাকি শুধু ধর্ষিতারা খবরের শিরোনাম হয়ে থাকবে? আমার প্রশ্ন, ধর্ষণের জন্য কি শুধু পুরুষেরা দায়ী? নাকি নারীও দায়ী থাকে?

আর কত বোনকে ধর্ষিত হতে হবে ওই সব নরপশুর কাছে? ধর্ষণের কথা বলতে গেলে চলে আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের হাতে আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত হারানোর কথা। সেই ৭১’র সময় পাক বাহিনীর হাতে আমাদের কত মা-বোন ইজ্জত দিয়েছেন তার কোন নির্দিষ্ট হিসাব নেই।

১৯৭১ গেছে, আজ ২০১৭। ধর্ষণ কিন্তু থেমে নেই। একাত্তরের যুদ্ধের সময় মা-বোনরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আজকে কেন ধর্ষণ করা হচ্ছে আমাদের বোনকে?

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপপরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে নারীর ওপর সব মিলিয়ে ২৪ ধরণের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ৫৫ হাজার ৯৯৫টি। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা সাত হাজার ২৩২টি। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা এক হাজার ৩৭২টি। গণধর্ষণের ঘটনা দুই হাজার ৮৫৪টি। ধর্ষণ-সংক্রান্ত এই তিন ধরনের অপরাধ ঘটে ১১ হাজার ৪৫৮টি। ধর্ষণ-সংক্রান্ত অপরাধের পরেই সংখ্যার দিক দিয়ে বেশি অপরাধ হত্যাকাণ্ডের। হত্যাকাণ্ড ঘটে ১০ হাজার ১৬১টি। এরপর বেশি ঘটনা শারীরিক নির্যাতনের। নারীর ওপর এ ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটে পাঁচ হাজার ৬২৭টি। দেখা গেছে, ১৪ বছরের এই হিসাব ধরে প্রতি বছরে গড়ে ধর্ষণ-সংক্রান্ত অপরাধ ঘটেছে ৮১৮টি। প্রতিদিন ঘটছে এ ধরনের দুটি অপরাধ। প্রকাশ হওয়া ঘটনার আড়ালে ধর্ষণের ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে এ ধরনের মামলার সংখ্যা বাড়ছে।

আরেফিন সোহাগ,
লেখক ও সাংবাদিক
মোবাইল: +৮৮০১৭৩১৬৬৪৬৬৬
ইমেইল: arefin24shohag@gmail.com

খোলা কলামে প্রকাশিত সব লেখা একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে পত্রিকার কোন সম্পর্ক নেই।

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: