রোহিঙ্গা ইস্যু

রাখাইন রাজ্যকে জনহীন করাই মিয়ানমারের টার্গেট!

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৫:০২:১০

সাইফুল ইসলাম,
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট:

রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা এখন নাগরিকত্বহীন। এদেরকে বলা হচ্ছে বাঙালি মুসলমান সন্ত্রাসী। সেই রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিডি টোয়েন্টিফোর লাইভকে জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।

মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে সমস্যার সূত্রপাত:

মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা সেই মোঘল আমল বা তারও আগে থেকে আছে কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত হয় ১৯৫৮ সালে যখন দেশটিতে সামরিক শাসন শুরু হয় এবং আমার কাছে মনে হয় যে, মূল সমস্যার দুটি দিক আছে। একটা ধর্মীয়, আরেকটি অর্থনৈতিক। ধর্মীয় দিক থেকে আমরা দেখছি যে, গরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারি বৌদ্ধরা লঘিষ্ঠ ধর্মের অনুসারি রোহিঙ্গাদের উপরে নির্যাতন চালাচ্ছে। কাজেই আপাতদৃষ্টিতে সংকটটি গরিষ্ঠ-লঘিষ্ঠ দ্বন্দ্ব হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। আরেকটি দিক হচ্ছে যে, ওই রাখাইন রাজ্যটিকে পরিপূর্ণভাবে জনহীন করে সামরিক সরকার অর্থনৈতিক কিছু প্রকল্প করতে চায় এমন তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। সুতরাং রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যা চলছে তা হচ্ছে জাতি বিনাশ, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘এথনিক ক্লিনজিং’। যা চলছে তা একটি বর্বর দেশেই সম্ভব।

রোহিঙ্গারা এখন নাগরিকত্বহীন এবং রাষ্ট্রদোহী:

রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা এখন নাগরিকত্বহীন এবং রাষ্ট্রদোহী। এদেরকে বলা হচ্ছে বাঙালি মুসলমান সন্ত্রাসী। মোঘল আমল থেকে এই অঞ্চলে বাঙালি গমন এবং আবাসন। ঠিক একই সময় থেকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তা সমূহের আগমন এবং যারা বাংলাদেশের পরিপূর্ণ নাগরিক। তাহলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক হবে না কেন? কফি আনান কমিশনের সুপারিশও অভিন্ন যে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে কিন্তু লক্ষণীয়, কফি আনান কমিশন সুপারিশ চূড়ান্ত করার পরপরই নতুন করে ২৪ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হয়েছে।

রোহিঙ্গার সংখ্যা:

বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা আবার আসতে শুরু করেছে। তাদের আসা শুরু হয়েছিল সেই ১৯৭৮ থেকে, ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৭ লাখের মতো রোহিঙ্গা আছে। আর সম্প্রতিকালে এসেছে ৩ লাখেরও বেশি। গোটা রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা তো ১১ থেকে ১২ লাখ বাস করত। তারা সবাই এখন উদ্বাস্তু, বিভিন্ন দেশে শরণার্থী শিবিরে তাদের আবাসন হয়েছে।

মিয়ানমারে যে গণতন্ত্রের উত্তরণ:

এক সময় তো তথাকথিত গণতন্ত্রে উত্তরণের পূর্ব পর্যন্ত মিয়ানমারকে বলা হতো একটা বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি একটি ভিন্নধর্মী ধর্মীয় রাষ্ট্র ছিল। তবে অং সান সুচির নেতৃত্বে মিয়ানমারে যে গণতন্ত্রের উত্তরণ হয়েছে তা অনেকটা প্রহসনমূলক। কারণ দেশটির সর্বময় ক্ষমতার চাবি-কাঠি এখনো রয়ে গেছে সেনাবাহিনীর হাতে। সংসদে তারা এক চতুর্থাংশ। ক্ষমতার ভাগাভাগিতেও তারা সিংহভাগ দখল করে আছে। অং সান সুচি আসলে একটি পুতুল সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পুতুল নাচাচ্ছে সামরিক বাহিনী। সুতরাং অং সান সুচি এখন যা বলছেন তা শান্তিতে নোবেল বিজয়ী একজন ব্যক্তিত্বের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তিনি যা বলছেন তা সামরিক বাহিনীর ভাষাতেই বলছেন। সামরিক বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি এবং অং সান সুচির অবস্থান অভিন্ন। সে জন্যে অং সান সুচিকে দোষী করে আমরা বেশি একটা এগোতে পারব না। অং সান সুচি নিরূপায়, তিনি ক্ষমতা হারাতে চান না। গৃহবন্দি হতে চান না। নির্যাতিত হতে চান না। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থেকে যেতে চান।

আরসা-‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’গড়ে উঠার পেছনের কারণ:

২০১২ সালে অং সান সুচি নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণের মূল কথাটি হলো যে, ‘যদি কোনো জনগোষ্ঠী নির্যাতিত হয় তাহলে তারা সংক্ষুব্ধ হয় এবং তারা উগ্রবাদী হয়ে ওঠে।’ ২০১৩ সালে দেখা গেল আরসা-‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ গড়ে উঠল। আমার কাছে মনে হয় যে, আরসা গড়ে উঠেছে অং সান সুচির বক্তব্যের বহিঃপ্রকাশের প্রকৃত দৃষ্টান্ত হিসেবে। যখন অং সান সুচি মানুষের মানুষের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন তখন তার দেশ এই একই ধরনের নির্যাতনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

দীর্ঘমেয়াদি একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার:

আমরা দেখেছি যে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রশ্নে কোনো সুচিন্তিত দীর্ঘমেয়াদি নীতি কোনো সময় গ্রহণ করেনি। সবসময় সাময়িক ভিত্তিতে বা ইংরেজিতে যাকে বলা হয় এডহক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে কূটনীতিতে অনেক সময় সাময়িক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়; কিন্তু তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার, যেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি না। এখন সারা বিশ্বব্যাপী একটা প্রতিক্রিয়া গড়ে উঠেছে। এই প্রতিক্রিয়াকে কাজে লাগাতে হবে বাংলাদেশের। কারণ বুঝতে হবে বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটটি যদি চলমান থাকে তবে এটা আরও জটিল এবং বহুমাত্রিক হয়ে উঠবে।

বিডি২৪লাইভ/এসআই/এমআর

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: