বি করিম

প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার

‘সবাই এই আলোতে ভেজে না’

০৮ অক্টোবর, ২০১৭ ২১:২৮:১০

"সত্যি সে জানেনা? আপনারা জানান নি?"
"নাহ"

"কেন? মানে সে সত্যিই তার অসুখটার নাম জানে না?"
"জানে হয়ত। আমরা আসলে সরাসরি ওকে কিছু বলিনি। বলতে ইচ্ছে করে না"

"কেন? তার তো জানার অধিকার আছে। অদ্ভুত শোনালেও অধিকার আছে"
"জানি রে ভাই। অধিকার নিয়ে কি করবে? দুদিন ভালো মন্দ খাবে? আমরা আসলে ওর মুখটার দিকে তাকাতে পারি না। চাই ও যেভাবেই থাকুক, অন্তত মুখে হাসিটা নিয়ে আমাদের মাঝে থাকুক"

কথা হচ্ছিলো পেসেন্টের ছোট ভাইয়ের সাথে। তার সাথে একটা ল্যাপটপ এর ব্যাগ। সেটাই বলা চলে তার কাজের হাতিয়ার। ফ্রিল্যান্সিং করেন। ভাইয়ের অসুখের পর নিজের কাজে সময় দিতে পারছেন না। সম্ভবও না। ক্লান্ত চেহারা নিয়ে বসে ছিলেন আমার পাশের চেয়ারে।

তারিখটা অক্টবরের ২

সন্ধ্যায় বের হলাম নিজেকে দই ফুচকা খাওয়াবো বলে। মিরপুর ১ এ একটা দোকান চিনি। বেশ ভালো বাসায়। লুঙ্গি টিশার্ট পরেই চলে এলাম। এসে দেখি দোকানে আন্টিদের ভিড়। দই ফুচকা ক্যানসেল।

শহর বদলাতে হবে। টিকেট করতে চলে গেলাম কল্যানপুর। করলাম। অনেকদিন কল্যানপুর ওভার ব্রিজের নিচের খিচুড়ি খাওয়া হয়না। কি মনে করে খেতে বসলাম ভর সন্ধ্যায়। দারুন লাগলো। আহা...

হেঁটে বাসায় ফেরার পথে নজরুল ভায়ের ফোন।

রোগী পাওয়া গেছে। আমাকে পাওয়া যাবে কি না। প্লাটিলেট দিতে হবে। বললাম কনফার্ম করেন। আমি আছি।

বাসায় ফিরলাম। ফোনটা চার্জে দিয়ে গোছল দিলাম। বের হয়ে আতিক ভায়ের দোকান থেকে দু টাকা দিয়ে দু গ্লাস পানি খেলাম। বললাম দিতে যাচ্ছি। আতিক ভাই হাসলো।

শাহবাগের পিজিতে পৌছতে রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেলো। রক্তের স্যাম্পল দেয়ার আগে চেক করে নেয় ডোনার প্লাটিলেট দিতে পারবে কি না। আমাকে আজ বেশ ভালো ভাবেই রিজেক্ট করে দিলো। আমার ভেইন পাওয়া যাচ্ছে না।

স্বাভাবিক। ঈদের পর থেকে শুধু খাওয়ার উপর আছি। মোটামুটি জোর দিয়েই বললাম আমি পারবো। এর আগে এফেরেসিস প্লাটিলেটই দিয়েছি ১২ বার। এবারও পারবো। তাছাড়া রোগীর অবস্থা ভালো না বেশি। ওরা আর ডোনার পায়নি আজকের জন্য। এবং প্লালিলেট আজ রাতেই লাগবে।

আমার কথা শুনেই মোটামুটি আমতা আমতা করে আমাকে পাশ করিয়ে দিলো। আমার হাতে ঘন্টাখানেক সময় ছিলো। কয়েক দফায় ৪০ বার পুস আপ দিলাম। পানি খেলাম। বাইরের বারান্দায় বসে সেখানে রাখা স্টিলের বেঞ্চ তোলা শুরু করলাম। এতে কব্জি, কনুই এ চাপ লেগে ভেইন ফুলে।

এবং সহজেই প্লাটিলেট দিতে পারলাম। আজো লাগলো প্রায় এক ঘন্টা। শেষ হতে হতে রাত বারোটা বেজে গেলো।

শাহবাগ মোড়টা আজ অনেক বেশিই শান্ত। হাঁটতে ইচ্ছে করলো। গত রাতে চট্টগ্রাম থেকে এসেছি। দিনে ভালো ঘুমও হয়নি। শরীর ক্লান্ত ছিলো। এই ক্লান্তি অনেকটা নেশার মত। এই নেশা অদ্ভুত সব ভাবনা ভাবায়। শরীর থেকে মন ক্লান্ত হয়। তখন ঘুম আসে। ঘুম নিয়ে যেন হেঁটে বেড়ানো।

যার জন্য প্লাটিলেট দেয়া তাকে নাকি জানানো হয়নি তার ব্লাড ক্যান্সার। নাটকীয় ব্যাপার, তার ছোটবেলায় পোলিও হয়। সে হাঁটেও এক পায়ে কোন রকম। আর এখন এই অবস্থা।

খুব বেশি চাপা স্বাভাবের। কাউকে নিজের কষ্টের কথা বলে না। আর এখন তাকে তার অসুখের কথা বলা হচ্ছে না। পরিবারের সবাই চাইছে সে যদি চলেও যায় অন্তত এই দিন গুলো টেনশান জিনিসটা থেকে দূরে থাকুক। একটু খুশি থাকুক।

আমার ধারনা সে জানে। নিজের অসুখ সম্পর্কে জানে। এবং উল্টো বাড়ির সবাই যাতে টেনশন না করে সেজন্য হয়ত নিজেই সব চেপে গেছে।

চাপা স্বভাবের মানুষ তো এমনই হয়। সবকিছু নিজের বুকের মধ্যে কবর দিতে তারা ওস্তাদ। কেউ টেরও পায় না কি চলে তাদের মধ্যে।

আমার কি তার সাথে দেখা করতে ঢাকা মেডিকেলে যাওয়া উচিত?

গিয়ে মাঝরাতে তাকে বের করে সদরঘাটে কোন নৌকায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকতাম। কিছু বলতাম না। সেও বলতো না। তাকে শুধু চাঁদের আলোতে গোছল করাতাম। সবাই এই আলোতে ভেজে না। যারা কবর দিতে যানে তারা ভেজে।

অনেকে বলে আমি নাকি খুব ভালোবাসা ছড়াতে পারি। পজিটিভলি সব নিতে পারি, দিতে পারি। আমি এখন পর্যন্ত অনেকগুলো মানুষ দেখেছি যারা মোটামুটি নিশ্চিত ভাবে মারা যাবার পথে।

প্রত্যেকের সাথেই আমি নিজের সবচেয়ে সুন্দর হাসি আর সবচেয়ে শক্তিশালি আত্মবিশ্বাসটা নিয়ে কথা বলেছি। আমার সাথেও তারা সেটাই করেছে। কেন জানি মনে হয়েছে তারা আমার কথা বিশ্বাস করেছে। আমার এই লোকটার কাছে যেতে ইচ্ছে হলো। গিয়ে বলতে ইচ্ছে হলো আপনি ছোটবেলা থেকে এত কষ্ট পাচ্ছেন বলেই হয়ত কেউ না কেউ অনেক সুখে আছে।

এটা এই পৃথিবীর নিয়ম।। আমি সব সময় ফ্রন্ট সিটে বসি কারন রাস্তা দেখার লোভে না। ধান্দাটা অন্য কোথাও।

রাতে বাসায় ফিরলাম একটার দিকে। ঘুমালাম মরার মত। পরদিন মেয়েদেরকে খুব আগ্রহ নিয়ে ডান হাতের কনুই এর কাছের ফুটোটা দেখালাম।

আগ্রহ নিয়ে ওদের হাবভাব বোঝার চেষ্টা করলাম, ওদের মধ্যে স্বার্থপরের মত ঢোকানোর চেষ্টা করলাম, ওরা চাইলেই ওদের ছোটলোক বাবাটাকে নিয়ে সবার থেকে অন্যভাবে গর্ব করতেই পারে।

নেশাটা এখানেই ।

তারিখটা অক্টবরের ৭

সন্ধ্যায় জানতে পারলাম সেই রোগী নাকি আজ আছরের দিকে মারা গেছেন।

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: