স্বপ্নের বিদেশে বাংলাদেশী নারীদের দুঃসহ যন্ত্রণা

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০৮:২০:২৭

৫০ বছর বয়সের হিমু বেগম। সৌদি গিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে। একটি বাসায় কাজও দেয়া হয়েছিলো। তবে কাজের সঙ্গে যোগ হয়েছিলো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। শুধু ওই বাসায়ই নয়, তাকে কাজ করতে হয়েছে গৃহকর্ত্রীর ভাইয়ের বাড়িতেও। এভাবে প্রতিদিন কাজ সেরে ঘুমাতে যেতেন ভোর চারটার দিকে।

ওঠতে হতো সাত সকালেই। মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পেতেন তিনি। একটু এদিক-ওদিক হলেই নেমে আসতো নির্যাতন। এ অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে পথ খুঁজছিলেন তিনি। অবশেষে পালিয়ে যান গৃহকর্তার বাড়ি থেকে। আশ্রয় নেন রিয়াদস্থ দূতাবাসের সেইফ হোমে। এরপর দিন গুনতে থাকেন বাড়ি ফেরার। কিন্তু আজও ফেরা হয়নি তার। গৃহকর্তার দায়ের করা মামলায় আটকে গেছেন তিনি। দীর্ঘ ১৯ মাসের অধিক সময়েও সেই মামলার জট খোলেনি। ফলে সেইফ হোমে মাসের পর মাস কেটে যাচ্ছে তার। কবে মামলা নিষ্পত্তি হবে আর কবেই বা বাড়ি ফিরবেন- তা তার অজানা।

শুধু হিমুই না, দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন সেইফ হোমে আশ্রয় নেয়া ও ইমিগ্রেশন ক্যাম্পে অবস্থানরত শতাধিক নারী। তারা কেউই জানেন না মামলার এ খড়গ কবে তাদের কাঁধ থেকে সরে দেশে ফিরতে পারবেন। রিয়াদের সেইফ হোমে আশ্রয় নেয়া নারীরা জানান, সেখানে তাদের খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধা না হলেও অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। এদের মধ্যে একজন আত্মহত্যাও করেছেন। গত ১লা জানুয়ারি আরিফা নামেও ওই নারী নিজেই নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করেন বলে তারা জানিয়েছেন। এছাড়া সেইফ হোমে মানসিক ভারসাম্য হারানো এক নারীর অস্বাভাবিক আচরণের ভিডিও পাঠিয়েছে আশ্রয় নেয়া নারীরা। এদিকে গত ২১শে জানুয়ারি সেইফ হোমে আশ্রয় নেয়া ২৪ নারী কর্মীকে ফেরত আনতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে একটি আবেদন করেছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। এসব নারী কর্মীর অভিভাবকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা ওই চিঠি দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

২৮ বছরের গৃহবধূ সখি জানান, তিনি সৌদি যাওয়ার পর মালিকের বাসায় ৫ মাস কাজ করেছিলেন। কিন্তু তাকে ওই এক বাসায়ই কাজ করতে হতো না। গৃহকর্ত্রীর মায়ের বাসায়ও কাজ করতে হতো। এতো কাজ করার পরও ঠিকমতো খেতে দিতো না। কোনো বিশ্রামের সুযোগ ছিলো না। ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিতে গেলেই তাকে মারধর করতো। তিনি বলেন, দুই বাসার কাজ সেরে তাকে ভোর চারটার সময় ঘুমাতে যেতে হতো। দুই-আড়াই ঘণ্টা ঘুমানোর পর আবারো কাজে নেমে পড়তে হতো। তিনি আরো বলেন, এই সময়ে তিনি কখনো ভাত চোখে দেখেননি। এভাবে পাঁচ মাস পর একদিন এক ভারতীয় নাগরিকের সহযোগিতায় পালিয়ে যান। এর আগেই তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় গৃহকর্তারা। পালিয়ে গিয়ে তিনি পুলিশের কাছে ধরা দেন।

ঘটনা জানানোর পর পুলিশ তাকে দূতাবাসের সেইফ হোমে পাঠিয়ে দেয়। পরে গৃহকর্তা মামলা করায় তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি। গত ৬ মাস ধরে তিনি রিয়াদস্থ সেইফ হাউজেই রয়েছেন। চাঁদপুরের এক নারী জানান, তিনি দুই মাস ধরে সেইফ হোমে। এর আগে দুই বছর এক মালিকের অধীনে কাজ করেছিলেন। এই দুই বছর ধরেই তাকে মারধরসহ নানাভাবে যৌন নির্যাতনে শিকার হতে হয়েছে। এছাড়া ৮ মাসের বেতনও দেয়া হয়নি তাকে। পরে তিনি পালিয়ে পুলিশের মাধ্যমে সেইফ হোমে আশ্রয় নেন। বর্তমানে মামলা চলমান থাকায় দেশে ফিরতে পারছেন না। সেইফ হোমে আশ্রয় নেয়া নারীরা জানান, তাদের সঙ্গে থাকা ৫-৬ জন নারী কর্মী মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়েছেন। গৃহকর্তার নির্যাতনে তাদের এই অবস্থা হয়েছে। এই নারীদের জন্যও তারা ভীত। যে কোনো সময় অঘটন ঘটার আশঙ্কা করছেন তারা। তারা আরো বলেন, এর আগে গত ১লা জানুয়ারি ওই সেইফ হোমে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারী নিজেই নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করেছেন। তার বিস্তারিত ঠিকানা জানা না গেলেও তারা বলেন, মেয়েটির নাম আরিফা। বয়স ২০-২২ বছরের মতো। এ ঘটনায় তারা সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। আশ্রয় নেয়া নারীদের পাঠানো এক ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নারী ছটফট করছেন। চিৎকার করে কান্নাকাটি করছেন। বলছেন, ‘আমাকে বাড়ি নিয়ে যা।’ আবার কাঁদতে কাঁদতেই দৌড় দিচ্ছেন। এই অবস্থা থেকে দ্রুত ফেরত আনার জন্য নারী কর্মীরা সরকারের কাছে দাবি জানান।

এদিকে ২৪ নারী কর্মীকে ফেরত আনতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে দেয়া ব্রাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের আবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ জন অভিভাবক জানিয়েছেন, সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের সেইফ হোমে বিভিন্ন সময় ধরে অনেক বাংলাদেশি গৃহকর্মী অবস্থান করছেন। পরিবারগুলোর অভিযোগ, সৌদি আরবের নিয়োগকর্তা কর্তৃক বিভিন্নভাবে শারীরিক, মানসিক নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না দেয়া, চুক্তি অনুযায়ী বেতন পরিশোধ না করা এবং অধিক কর্মঘণ্টা তাদেরকে কাজে নিয়োজিত রাখার কারণে কর্মক্ষেত্র থেকে পালিয়ে দূতাবাসের সেইফ হোমে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু নিয়োগকর্তার পুলিশি অভিযোগের কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ দেশে ফিরতে পারছেন না গৃহকর্মীরা। পরিবারগুলো যতদ্রুত সম্ভব আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা নারী কর্মীদের নিরাপদে দেশে ফেরত আনতে সহায়তা কামনা করেন। এসব নারীকর্মীকে দেশে ফেরত আনতে সহাযোগিতা চেয়েছে ব্র্যাক। এ ব্যাপারে সংস্থাটির মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য কর্মকর্তা আল আমিন নয়ন বলেন, এই আবেদনের দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন বলেও জানান। আবেদনের ব্যাপারে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহকারী পরিচালক জাহিদ আনোয়ার বলেন, ব্র্যাকের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা তা দূতাবাসকে পাঠিয়েছি। কিন্তু দূতাবাস প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে জানাবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সূত্র: মানবজমিন।

বিডি২৪লাইভ/এমআর

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: