শিহাব খান

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

শ্রীপুরে সরকারি প্রাথমিকে ভরসা নেই অভিভাবকদের

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ২১:৩৭:৫০

ছবি: প্রতিনিধি

নিয়মিত পাঠদান না হওয়া, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, রাজনৈতিক বেড়াজাল ও অনিয়ম দুর্নীতির কারণে বেহাল অবস্থায় গাজীপুরের শ্রীপুরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। কর্তৃপক্ষের সঠিক নজরদারীর অভাবে শিক্ষার আলো বঞ্চিত হয়ে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে অভিভাবকরা। আর এ সুযোগে উপজেলার সর্বত্রই শিক্ষা নিয়ে বাড়ছে বাণিজ্য।

উপজেলা শিক্ষা অফিস, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শ্রীপুর উপজেলা জুড়ে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিকরণে ১৬৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান করা হচ্ছে, এতে প্রাক প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এক লাখ তিন হাজার পাঁচশত পঞ্চাশ জন শিক্ষার্থী পাঠ নিচ্ছে। যদিও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সংখ্যা চৌদ্দহাজার একশত। অপরদিকে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে দুইশত পঞ্চাশটি। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৪৫টি ও সহকারি শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৫৫টি। এ গ্রেডের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে ৫৮টি বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭১টির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে। বিদ্যালয় গুলোকে সাতটি ক্লাস্টারে বিভক্ত করা হয়েছে।

প্রতিটি বিদ্যালয়ে রয়েছে পরিচালনা পরিষদ যাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। মূলত প্রধান শিক্ষককে নিজ হাতের মুঠোয় বন্দী করে তাঁরা গড়ে তুলেন বাণিজ্য। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবাধে শিক্ষার্থীদের নোট গাইড বই ক্রয়, কোচিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিটি স্তরে স্তরে চলে অর্থ আদায় পরীক্ষার ফি, খেলাধুলার ফি, উন্নয়ন ফির নাম দিয়ে পকেট ভারীতে ব্যস্ত থাকেন শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদ। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানে দিন দিন অমনোযোগী হয়ে পড়ছেন সরকারী শিক্ষকরা।

তাই সচেতন অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের টাকা খরচ করেও বেসরকারি কিন্ডার গার্টেনের দিকে ঝুঁকছেন। এসব সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে বছরের বিভিন্ন সময় সরকার হতে প্রেরণকৃত টাকারও নয় ছয় হয়। এসব কাজে ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মূলত প্রাথমিক শিক্ষায় বাণিজ্য তৈরি হওয়ায় বিনামূল্যের প্রাথমিক শিক্ষা হতে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

ধনুয়া এলাকার আহাম্মদ আলী নামের একজন অভিভাবক জানান, তাঁর বাড়ির পাশেই রয়েছে ধনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কিন্তু এখানে কোন ধরনের লেখাপড়া হয় না। শিক্ষার্থীরা খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকেন। তাই তাঁর চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেকে মাওনা চৌরাস্তার শাহীন ক্যাডেট একাডেমিতে ভর্তি করেছেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা।

মুলাইদ গ্রামের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আজিজুল হক জানান, শিক্ষকদের আদেশে তাঁর তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীর জন্য গাইড বই কিনতে হয়েছে। এছাড়াও প্রতিদিন বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক কোচিং করতে হয়। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষায় সবই এখন খরচ করতে হয়।

গলাদাপাড়া গ্রামের আমিরজান নামের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক তাদের এলাকায় কোন বেসরকারি কিন্ডার গার্টেন গড়ে উঠেনি, আবার প্রাথমিক বিদ্যালয়েও কোন পড়ালেখা হয় না। এ নিয়ে তিনি তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত।

বদনীভাঙ্গা গ্রামের মোবারক হোসেন নামের একজন অভিভাবকের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো এমন এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছুটা পড়াশোনা হলেও মফস্বল এলাকায় লেখাপড়া তেমন নেই। তার এলাকার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই ঠিকমত আসেন না।

মাধখলা গ্রামের ব্যবসায়ী সুজন কুমার পন্ডিত জানান, তাঁর মেয়েকে প্রথমে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু সেখানে কিন্ডার গার্টেনের চেয়ে খরচ কম, কিন্তু পড়াশোনার মান নেই। তাই সরকারি সেবা ছেড়ে কেজিতে ভর্তি করেছেন। এখানে খরচ হলেও কিছুটা পড়াশোনা হয়।

মুলাইদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনুকুল সরকারের মতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে তিনি কোচিং করান। তবে বৈধ কি অবৈধ এ বিষয়ে তিনি বলতে পারবেন না। তবে সবকিছুই পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত মতেই হচ্ছে।

মাওনা ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল হক খান জানান, বিদ্যালয়ে কোন কিছু এককভাবে করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্তও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আর একটি বিদ্যালয় পরিচালনা করতে অনেক খরচ হয় এজন্য বাড়তি টাকার প্রয়োজন কিন্তু সরকার হতে সবসময় তা পাওয়া যায় না।

শ্রীপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সিদ্দিকুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল অবস্থার কথা অস্বীকার করে জানান, সরকারের নিয়ম মোতাবেক প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালিত হচ্ছে। তবে সে সকল প্রতিষ্ঠানে কোচিং নোট গাইড বইয়ের ব্যবহার আছে তা বন্ধের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিডি২৪লাইভ/এমকে

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: