রিপন আলি রকি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

১৮ বছরেও খোঁজ নেয়নি কেউ!

১৮ মে, ২০১৮ ১০:৪০:০০

ছবি: প্রতিনিধি

আমার সারা দেহে বুলেটের ক্ষত চিহ্নগুলো আজও মনে করিয়ে দেয় বর্বর গুলিবর্ষনের কথা। সেদিনের কথা মনে পড়লে আজও উৎকন্ঠা হয়ে পড়ি আমি। দেশ রক্ষার্থে ও কর্তব্য পালন করতে গিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনীর বুলেটের আঘাতে সারা দেহপাত ঝাঁজরা হয়ে গেলেও শেষ নিশ্বাস থাকা পর্যন্ত দায়িত্বে অটল ছিলাম। আজ আমি পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবনযাপন করছি। দেড় যুগ পার হয়ে গেলেও নেয়নি কোন খোঁজ, জানতে চায়নি কেউ কেমন আছি আমি?

মনে চরম ক্ষোভ, দুঃখ আর আবেগ নিয়ে অঝরে কেঁদে কেঁদে জীবন যুদ্ধের গল্প শুনালেন একজন সাবেক সাহসী সেনা সদস্য এলাম হোসেন। এলাম হোসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের লছমানপুর গ্রামের মৃত মমতাজ উদ্দিনের ছেলে।

১৯৮১ সালের ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এলাম হোসেন। ১৫-ইস্ট বেঙ্গল রেজিঃ এর পার্বত্য চট্টগ্রামের মানিকছড়ি জোনের দুল্লাতলী ক্যাম্পের অধীনে কর্মরত ছিলেন তিনি। পার্বত্য এলাকায় সেনাবাহিনীর দুটি পেট্রোল টিমকে নিরাপদে ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনতে ২০ জনের আরেকটি পেট্রোল টিম যাচ্ছিলো। সেই টিমের সাথেই ছিলেন এলাম হোসেন।

সকল টিম একসাথে ফেরার পথে হটাৎ পার্বত্য এলাকার শান্তি বাহিনীর সন্ত্রাসীরা তাদের উপর নির্বিচারে অতর্কিত হামলা ও গুলি চালাই। সেই দিনটি ছিল ১৯৯৫ সালের ২৫ জুন। ঘটনাস্থলে লেঃ কর্পোরাল লতিফ নিহত হন। গুরুতর আহত হন আরও দুই সেনা সদস্য। আর এলাম হোসেনের দেহে মোট ৫টি বুলেট আঘাত হানলেও বেঁচে ফিরেন তিনি।

সাবেক সেনা সদস্য এলাম হেসেনের ডান হাতের কুনোই একটি, বাম কাঁধে একটি, বাম পায়ের রানে একটি, ডান পায়ের গোড়ালিতে একটি ও পেটের ডান দিকে একটি বুলেট সহ মোট ৫টি বুলেট তার দেহ ভেদ করে রক্তাক্ত জখম হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে অবস্থার অবনতি দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচার ও অপারেশনের মাধ্যমে তিনি নতুন ভাবে পৃথিবীর আলো দেখেন।

চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য ও মেডিকেল সার্টিফিকেট অনুযায়ী ৭০ ভাগ অক্ষম হন সাবেক এ সেনা সদস্য। যা পঙ্গুত্বের সামিল। আর এরকম 'সি' ক্যাটাগরীর জীবন নিয়ে ফিরতে হয় তাকে। সেই অদম্য সাহস আর উদ্দোম শক্তি হারাতে হয় তাকে। জীবন্ত লাশ হয়ে আর পঙ্গুত্বকে বরণ করে নতুন ভাবে পথচলা শুরু করেন আবারও। ১৯৯৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর চাকরী থেকে অবসরে যান তিনি।

এলাম হোসেন জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তির আগে অসংখ্য সেনা সদস্য প্রাণ হারালেও নেয়া হয়নি তাদের খোঁজ। দেওয়া হয়নি কোন সম্মাননা বা শান্তনা। সে ভয়াবহ ঘটনার ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও খোঁজ করেনি কেউ। জানতে চায়নি কেমন আছি আমরা।

বর্তমানে স্ত্রী ও চার কন্যা সন্তান নিয়ে জীবনযাপন করছেন তিনি। বড় মেয়ে আলমিশা আক্তারের বিয়ে দিয়েছেন, মেজ মেয়ে ইশরাত জাহান নিশা এবছর এসএসসি'তে জিপিএ-৫ গোল্ডেন অর্জন করেছে, সেজ মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা অষ্টম শ্রেণীতে পড়াশুনা করছেন এ ছোট মেয়ে আরসিকা হক চতুর্থ শ্রেনীতে পড়াশুনা করছেন। ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ জোগাতে হিমসিম খেতে হয় এলাম হোসেনকে।

পঙ্গুত্ব ও অবসরজীবনে সামান্য রেশনের টাকা দিয়েই চলছে সংসার। আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে মেধাবী মেয়েদের উন্নত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনার সুযোগ করে দিতে পারছেন না তিনি।

বিডি২৪লাইভ/এমআরএম

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: