
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমাকে অপসারণের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে পার্বত্য সম অধিকার আন্দোলন। এর আগে সকাল ১১টায় খাগড়াছড়ি পৌরসভা প্রাঙ্গণ থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল করে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) সকাল ১১টায় সুপ্রদীপ চাকমাকে আওয়ামী সুবিধাভোগী, সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব ও উপজাতীয় সশস্ত্র গ্রুপের অন্যতম পৃষ্টপোষক আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি জেলা শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে এক বিক্ষোভ প্রতিবাদ সমাবেশ করে সংগঠনটি। এসময় খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ফেরদৌসী বেগম ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রোজলীন শহিদ চৌধুরী নিকট স্মারক লিপি প্রধান করা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের নেতা অ্যাডভোকেট করিম উল্ল্যাহ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সুপ্রদীপ চাকমা একজন দুর্নীতিবাজ এবং পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, স্নেহভাজন ও তার আমলে অন্যতম সুবিধাভোগী ছিলেন। তিনি আওয়ামী সরকারের সময় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন এসময় দূর্নীতির দায়ে দুদকে তার নামে মামলা হয়। যা এখনো চলমান রয়েছে। গত ২০২৩ সালের ২৪ জুলাই সুপ্রদীপ চাকমাকে সচিব মর্যাদায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এখনো তিনি সে পদেই বহাল রয়েছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'সুপ্রদীপ চাকমা উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও তৎপর হয়ে উঠেছে। খাগড়াছড়ির রামগড়ে উপজাতি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্তৃক এক বাঙালি গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তিনি বাঙালিদের অ-পাহাড়ি বলে বক্তব্য দিয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হয়ে উঠছে। অবিলম্বে সুপ্রদীপ চাকমাকে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে বাদ দিতে হবে। অন্যথায় পার্বত্য চট্টগ্রামে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেনএই সম-অধিকার নেতা।'
পার্বত্য চট্টগ্রাম সম অধিকার আন্দোলন খাগড়াছড়ি জেলার সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন স্বাক্ষরিত স্মারক লিপিতে উল্লেখ করা হয়, সুপ্রদীপ চাকমা পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালি নাগরিকদের মাঝে বিভেদ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে ইতিমধ্যে শান্তিপ্রিয় সাধারণ নাগরিকগণ, ছাত্র-জনতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কারণ, সুপ্রদীপ চাকমা সুশীল সমাজের নামে আওয়ামী লীগ ঘরানা এবং উপজাতীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতাদের সাথে পার্বত্য জেলায় একাধিক বৈঠকের অভিযোগ উঠেছে।
গত ২৩ আগস্ট খাগড়াছড়িতে বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে আসলে, ঐদিন দুপুরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে সুশীল সমাবেশে সাথে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সুশীল সমাজের আড়ালে ঐ মতবিনিময় সভাটি ছিল “আওয়ামী লীগ” ঘরানার নেতাদের নিয়ে। যারা আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী। বৈঠকে বাঙালি সুশীল নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যমকে ডাকা হয়নি এবং সভার স্থানও জানতে দেয়া হয়নি। এমনও ঘটনা ঘটেছে, একটি বৈঠকে বাঙালি সম্প্রদায়কে অ-পাহাড়ি নামে সম্বোধন করে তার সাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রকাশ্যেও প্রকাশ করেছেন। এঘটনায় পাহাড়ে বসবাসরত প্রায় ৫২% বাঙালি জনগোষ্ঠীর মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে, তোলপাড় চলছে।
এছাড়াও তিনি আওয়ামী ঘরানার নেতাদের সাথে মতবিনিময় সভা শেষে আবার রাত ২ টায় গোপনীয়তার মধ্যে পাহাড়ের উপজাতীয় সশস্ত্রগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকে বসেন। ঐসব বৈঠকে যারা ছিলেন, উপদেষ্টা নিজেই তাদের ফোন করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সুপ্রদীপ চাকমার খাগড়াছড়ি অবস্থানকালে পুরো সময়টা ঘিরে থাকে আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকজন এবং উপজাতীয় সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উপদেষ্টা শ্রেণির লোকজন। ফলে পার্বত্য উপদেষ্টার সফর কোনো গোষ্ঠী বা মহলের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন কিনা জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্মারক লিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়, উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে পাহাড়ের জনগণ, রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডার বিভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠন, স্থানীয় সংগঠন, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে পাশ কাটিয়ে বৈষম্য করে যাচ্ছেন। তার সফর সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ও উপজাতীয় সশস্ত্র সংগঠনের উপদেষ্টাদের ব্যতীত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাউকে জানানো হয় নাই। এমনকি গণমাধ্যম মারফত জানতে পেরেছি, খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. নজরুল ইসলাম
জানিয়েছেন, সরকারি ভাবে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো তালিকাটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হয়নি।
পার্বত্য উপদেষ্টার সহকারী তালিকাটি সরবরাহ করেছেন। সেই তালিকা অনুসারেই আমরা সবাইকে জানিয়েছি। মতবিনিময় সভায় কারা বক্তব্য দিবেন, সে তালিকাও উপদেষ্টা নিজে ঠিক করে দিয়েছেন। এখানে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক বা প্রশাসনের হাত নেই। অপর দিকে রাঙামাটি এবং বান্দরবানেও সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়ের নামে ‘আওয়ামী লীগ নেতাদের’ সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ২৪ আগস্ট রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় আন্দোলনে আহত হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কাউকে ডাকা হয়নি।
ডাকা হয়নি বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, সম-অধিকার আন্দোলনের কোনো প্রতিনিধিকেও। অথচ বৈঠকে উপস্থিত ছিল আ’লীগ নেত্রী টুকু তালুকদার, জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের সভাপতি রফিক আহাম্মদ, আওয়ামী লীগের নিয়োগকৃত মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, আওয়ামী লীগের নিয়োগকৃত বর্তমান সদস্য বাঞ্চিতা চাকমা, আওয়ামী লীগের দোসর সংগঠন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা সুনীল কান্তি দে, পৌর আ’লীগের সহ-সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম প্রমূখ। অভিযোগ আছে, রাঙামাটিতে বৈঠক শুরুর আগে যাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি তাদের বের হয়ে যেতে বলা হয়।
বৈষম্য নিয়ে অভিযোগ করে উল্লেখ করা হয়, সুপ্রদীপ চাকমা স্থানীয় পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন নিয়োগ নিয়েও কথা বলেছেন। কিন্তু তার পক্ষপাতমূলক ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রকাশ পাওয়ায় এ নিয়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এমতাবস্থায় বিগত স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা আওয়ামী লীগের এজেন্টা বাস্তবায়ন করছে। ফলে তাকে অপসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছি আমরা। অন্যথায় আমরা সাধারণ মানুষকে নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হবো।'
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর