
নির্বাচন শেষ হওয়ার তিন বছরের বেশি সময় পর বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেনকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে ঘোষণা করে রায় দিয়েছে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল।তবে রায় পাওয়ার পরও গেজেট প্রকাশে সৃষ্টি হয়েছে আইনি জটিলতা বলে জানিয়েছেন সংস্থাটি।
ইসির আইন শাখার যুগ্ম সচিব ফারুক আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, এখন তো কমিশন নেই। কাজেই এখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে পর্যালোচনা করে নিতে হবে। আবার কমিশন না থাকলেও যে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, তা নয়। আদালত যদি আমাদের কাছে মতামত চায়, সেক্ষেত্রে আমরা বলবো যে গেজেট প্রকাশ করতে হলে কমিশনের অনুমোদন লাগে। এছাড়া যেহেতু রায় হয়েছে আমরা মতামত না চাইলেও মতামত দিতে পারি। উপদেষ্টা পরিষদের কাছেও করণীয় জানতে চাইতে পারি।
তিনি বলেন, আদালতের আদেশ যতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য ততটুকু বাস্তবায়ন করবো। যেটা বাস্তবায়নযোগ্য না সেটা বাস্তবায়ন হবে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের কাছে রায়ের কপি আসলে আমরা দেখবো। এমন না যে আদালতের আদেশে, যেভাবে আদেশ দিয়েছে সম্ভব না হলে সেভাবেই করতে হবে বিষয়টি এমন না। কমিশন নাই। এখন কমিশনের অনুমোদন আগ পর্যন্ত হয়তো আমরা উপদেষ্টা পরিষদ পর্যন্ত আমরা যেতে পারি। আর তারা তো আইন পরিবর্তন করতে পারবে না। সংসদে যে পাশকরা আইনে যে বিধান আছে, সেটা তারা পরিবর্তন করতে পারবে না। তবে যেহেতু স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার ভেঙ্গে দিয়েছে এবং সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে; এতে মনে হচ্ছে বিষয়টি ইনফ্রাকচুয়াস (অকেজো)। বেশি একটা কাজে আসবে বলে মনে হয় না। কারণ কমিশন থাকা অবস্থায়ও যদি এই আদেশ হতো, তাহলে কী হতো, ওই বাতিলের খাতায় তো পড়ে যেতো। এখন ওই পরিষদগুলোই তো বাতিল। সরকারের আদেশে যেহেতু বাতিল হয়েছে এই বিষয়টা অনেকটা ইনফ্রাকচুয়াস। বড় কথা হলো গেজেট করতে হলে কমিশন লাগে। এখন কমিশন নাই। কমিশনের অনুমোদনের পরিবর্তে বিকল্প কী আছে সেটা আমাদের পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।
মামলা তো সরকারের সিদ্ধান্তের আগে করা, সেক্ষেত্রে ইসির আইনি পদক্ষেপ কী হবে?এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইসির অনুপরিস্থিতিতে বিকল্প কী করা যেতে পারে তা পর্যালোচনা না করে বলা যাচ্ছে না। করণীয় বলতে সরকার যদি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতা দেয়, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আমার আসলে কোনটি করবো সেটি পর্যালোচনা না করে বলা যাবে না। কমিশন না থাকায় এখন এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তারা বলছেন,কোনো ভোটের গেজেট প্রকাশ করতে হলে ফুল কমিশনের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। বিগত কমিশন পদত্যাগ করায় সে অনুমোদন নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই নতুন কমিশন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কেউ আপিল না করলেও গেজেট প্রকাশ করা যাবে না।এছাড়া ইসি নিজেকেও আর আপিল করতে পারবে না।কারণ হলো এ ট্রইব্যুনাল তো ইসি নিজের থেকে গঠন করা।আবার অন্যদিকে আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে বিবাদী পক্ষ বা সংক্ষুব্ধ কোনো পক্ষকে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপলি করতে হয়।যদি আপিল করে তাহলে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত গেজেট প্রকাশ করা যাবে না।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯, এ নির্বাচনী বিরোধ বিষয়ে বলা হয়েছে- এ আইনের অধীন নির্বাচন সম্পর্কিত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশন একজন উপযুক্ত পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল এবং একজন উপযুক্ত পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও একজন উপযুক্ত পদমর্যাদার নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে।নিবার্চনী ফলাফল গেজেটে আকারে প্রকাশের ত্রিশ দিনের মধ্যে উপ-ধারা (১) এর অধীন গঠিত নিবার্চনী ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা যাবে এবং নিবার্চনী ট্রাইব্যুনাল কর্পোরেশনের নিবার্চন সংক্রান্ত যে কোন মামলা দায়ের করার একশত আশি দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করবে।নিবার্চনী ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মামলার রায় ঘোষণার ত্রিশ দিনের মধ্যে উপ-ধারা (১) এর অধীন গঠিত নিবার্চনী আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল দায়ের করা যাবে এবং নিবার্চনী আপিল ট্রাইব্যুনাল কর্পোরেশনের নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোন আপিল দায়ের করার একশত আশি দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করবে। নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনালের রায় চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে শাহদতের পক্ষে:চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের ফলাফল বাতিল চেয়ে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের দায়ের করা মামলায় তাকে মঙ্গলবার (০১ অক্টোবর) মেয়র ঘোষণা করেন আদালত। একইসঙ্গে আগামী ১০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবকে গেজেট প্রকাশ করার জন্য নির্দেশ দেন।দুপুর ১২টায় নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল হিসেবে চট্টগ্রামের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ খাইরুল আমীনের আদালত এই রায় দেন।
এদিকে রায় পাওয়ার পর শাহদতের আইনজীবী যা বলেছেন,ডা. শাহাদাত হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মঈনউদ্দীন হোসাইন সোহেল আদালতের রায় তুলে ধরে বলেন, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা ২০১০ এর ৫৩(২) ধারা মতে মামলায় ডা.শাহাদাত হোসেনকে বিবাদীগণের বিরুদ্ধে একতরফা সূত্রে বিনা খরচায় ডিক্রি প্রদান করা হয়েছে।
ওই আইনের ধারা ৫৯(খ) অনুসারে গত ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি সরকারের গেজেট অনুসারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একই বছরের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মেয়র হিসেবে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল করা হয়েছে। আইনের ৫৯(ক) অনুসারে এই মামলায় নির্বাচনে ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থী শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি জানান,আদালত আগামী ১০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলায় যে অভিযোগ করা হয়েছে,২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি চসিক নির্বাচনে কারচুপি ও ফল বাতিল চেয়ে মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন মামলা দায়ের করেন।
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওই নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পাওয়ায় নৌকার প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা অনুসারে, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মেয়রপ্রার্থী শাহাদাত হোসেন ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছিলেন ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট।
সর্বশেষ খবর