
‘গেছি মাইয়ার বাড়ি, আয়া দেহি আমার ঘর নাই। একমাস মাইনষের বাড়িতে আছিলাম। হেরা বাইর কইরা দিছে । এহন কই থাহুম। হের লইগ্যা হুদা ভিডার উরপে পলিথিন দিয়া ঘর উডাইছি। ঘরের ভিত্তে হুদা বাতাস আয়ে, শীতের কিচ্ছু নাই। বুড়া মানুষ কেমনে থাহুম ঘরে শীতের ভিত্তে। ’এভাবেই নিজেদের কষ্টের কথা বলছিলেন গত ১৭ নভেম্বর চরফ্যাশন পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের নীলিমা আদর্শ গ্রাম প্রকল্পের ঘর থেকে যুবদল, ছাত্রদল ও শ্রমিকদল নেতাদের উচ্ছের শিকার গৃহহীন ৬৫ বছর বয়সী বিধবা নারী আনোয়ারা বেগম।
স্বামী মফিজুল ইসলাম, দুই কন্যা পারভীন ও নাসরিনকে নিয়ে মেঘনা পাড়ের কুঁড়ে ছিলো বিধবা নারী আনোয়ারা বেগমের সংসার। বছর দশেক আগে হঠাৎ নদী ভাঙনে গৃহ হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রতিবেশীর বাড়িতে। বছর না ঘুরতেই স্বামী মফিজুল ইসলাম মাছ শিকারে গিয়ে সাগরে ডুবে মারা যান। সব হারিয়ে দুই কন্যা নিয়ে জীবন যুদ্ধ শুরু করেন তিনি। ভিক্ষা বৃত্তি করে জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্যেই দুই কন্যাকে বিয়ে দেন। মেয়েদের বিয়ের পর নিঃসঙ্গ আনোয়ারার আশ্রয় মেলে চরফ্যাশন পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নীলিমা আদর্শ গ্রামের ঘরে। তালাবদ্ধ ঘর রেখে মেয়ে বাড়ি গিয়েছিলেন, ফিরে দেখেন তার ঘর নেই, পড়ে আছে শূন্য ভিটে।
ওই আশ্রায়ণে গেলে দেখা হয় বিধবা মনোয়ারার সঙ্গে। শূন্য ভিটার উপর তেরপল আর পলিথিনের ছাউনি দিয়ে তোলা ঘরের সামনের বসে আছেন তিনি। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে রাজ্যের চিন্তা মাথায় নিয়ে বসে আছেন বিধ্বস্ত ভিটায় তোলা ঝুঁপড়ির সমনে। মানুষ দেখলেই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তিনি। কেউ যেন সুখবরের বার্তা নিয়ে আসবেন তার কাছে। ঘটনার দেড়মাস কেটে গেলেও কেউ সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। দেয়নি এতটুকু সহযোগী তাও।
বিধাবা আনোয়ারার মতোই কোথায় থাকার জায়গা না পেয়ে উচ্ছেদকারীদের অব্যাহত হুমকি ধামকি উপেক্ষা করে জীবনে ঝুঁকি জেনেও ফের শূন্য ভিটায় ঝুঁপড়ি ঘর তুলে তীব্র শীতের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ বাব-মা নিয়ে করুণভাবে মানবেতর জীবন যাপন শুরু করেছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২০ পরিবার। তবে সরকারী বরাদ্দ দেয়া আশ্রয়ণের ঘর থেকে উচ্ছেদের দেড় মাস পেঁরিয়ে গেলেও আশ্রিতদের পুনর্বাসনের কোন উদ্যোগ নেয়নি উপজেলা প্রশাসন। খবর রাখেনি আশ্রিত পরিবারগুলো।
নীলিমা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পলিথিনের ছাউনি বেড়া দিয়ে ঝুঁপড়ি ঘর তুলে বসবাস শুরু করেছেন কবির-আছুরা দম্পতি। কথা হয় দিন মুজুর কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, সব কিছুই স্বপ্নের মতো লাগছে। দুর্বৃত্তরা আমাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। ২০১৭ সনে সরকারী বরাদ্দ মতো আশ্রয়ণের একটি ঘর পাই। ভালোই চলছিল স্ত্রী-সন্তান আর প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা মা হনুফাকে নিয়ে। অভাব-অনটন থাকলেও একটু সুখ ছিল,স্বস্তি ছিল। ১৭ নভেম্বর কতিপয় বিএনপি নেতাদের উচ্ছেদের তাণ্ডবে গৃহ হারিয়ে আশ্রয় নেই প্রতিবেশী জাকির গাজীর বাড়িতে। একমাস থাকার পর সেখানেও আশ্রয় হয়নি তাদের। তাই বাধ্য হয়ে শূন্য ভিটায় ফিরে এসেছি। নতুন ঘর তোলার কিছুই নেই। তাই পলিথিন ও তেরপালের ছাউনি দিয়ে ঝুঁপড়ি ঘর তুলে বসবাস শুরু করেছি। আশ্রয় ফিরে পেতে প্রশাসনের কর্তাদের কাছে ঘুরেও কোন সুরাহা হয়নি। একমাস কেটে গেলেও খবর নেইনি কেউ।
কথা হয় দিন মুজুর কবিরের স্ত্রী আছুরার সঙ্গে । তিনি আক্ষেপ করে বলেন,‘মেঘনায় কাইরা নিলো হগলকিচ্ছু। আইলাম এহানে, একরাইতে সব কাইরা নিছে অরা। ছোট্ট পোলা, বুড়া হাউড়ি লইয়া এহন ডেরা ঘরে থাহি। ঠান্ডায় কাহিল থাহন যায়না। শীতের কিচ্ছুই নাই, হারা রাইত আতুর হাউরি কান্দে। শীতের ভিত্তে এহন এই ঘরে কেমনে থাহুম। এহন কই যামু কই তারিনা।’
২০১৭ সনের চরফ্যাশন পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নীলিমা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে আশ্রয় মেলে অসহায় ভূমিহীন ২০ পরিবারের। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনোয়ার হোসেন সরকারী অর্থায়নে খাসজমিতে টিনের ঘর নির্মাণ করে অসহায় পরিবারকে ২০ ঘর বরাদ্দ দেন। দীর্ঘ ৭ বছর ওই অসহায় পরিবার গুলো সরকারী বরাদ্দ পাওয়া ঘরে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আশ্রিতদের ঘর ভিটে নিজেরদের মালিকানা দাবী করে স্থানীয় যুবদল, ছাত্রদল ও শ্রমিকদল নেতারা ২০ পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি দেন। পরে গত ১৭ নভেম্বর রাতের আঁধারে কতিপয় নেতাকর্মীরা ২০ পরিবারের ঘর ভেঙে মালামাল লুট করে তাদের উচ্ছেদ করে দেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের বাসিন্দারা। প্রায় একমাস অন্যের বাড়িতে এবং স্বজনের বাড়িতে ভবঘুরে জীবন যাপনের পর কোথায় কোন আশ্রয় না পেয়ে বাধ্য হয়ে শূন্য ভিটায় ফিরছেন তারা। বর্তমানে শূন্য ভিটায় ঝুঁপড়ি ঘর তুলে বসবাস শুরু করেছেন। তাদের এমন দুরাবস্থায় এগিয়ে আসেনি উপজেলা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা। কতিপয় নেতাদের নামে মামলা করেই দায় সেরেছেন তারা।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাসনা সারমিন মিথি জানান, আশ্রয়ণের ঘর ভেঙে উচ্ছেদের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। যেহেতু ওই জমিটি সরকারী খাস জমির আওতায় এখানে কারো প্রবেশের সুযোগ নেই। জায়গাটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে। তবে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের এখনো কোনো সরকারী নির্দেশনা আসেনি।
শাকিল/সাএ
সর্বশেষ খবর