
উপজেলার রুকিন্দিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা দেওয়ান রাশেদ তার ষোল মাস বয়সী ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশু ছেলেকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। তখন জরুরি বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন না। দায়িত্ব পালন করছিলেন সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নাহিদা সুলতানা। তিনি শিশুটিকে ভর্তি করান। তিনজন চিকিৎসককে চলছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি তিনি। তাঁর অভিযোগ, চিকিৎসক সংকট তীব্র হওয়াই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা না পেয়ে তাঁর মতো অনেকেই বাড়িতে ফিরছেন। এখনো সুস্থ হয়নি তাঁর ছেলে।
গত কয়েকদিন থেকে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ২৬ জনের বিপরীতে বিশেষজ্ঞসহ চিকিৎসক মোট ২১টি পদ শূন্য রয়েছে। মাত্র তিন জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে সেবা। কাম্য সংখ্যক চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে ব্যাপক ভাবে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। দ্রুত চিকিৎসা সেবা পেতে রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিকে ছুটছেন রোগী ও স্বজনরা। এতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।
গত দুই মাসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে অধিদপ্তরে পর পর তিনবার চিকিৎসকের চাহিদা পাঠানো হয়। কিন্তু চাহিদা পাঠানোর পরও প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক পদায়ন হয়নি এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সর্বশেষ গত ১৯ ডিসেম্বর চিকিৎসক চেয়ে চাহিদা পাঠানো হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, এই উপজেলায় চিকিৎসক পদে ২৬ জনের বিপরীতে মাত্র ৫ জন কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে এক জন সহকারী ডেন্টাল সার্জন রয়েছেন এবং একজন চিকিৎসক বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে আছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদে ১১ জন থাকার কথা থাকলেও সেই পদে একজনও চিকিৎসক নেই। মেডিকেল অফিসার পদে ১৪ জন থাকার কথা থাকলেও সেখানে ৪ জন কর্মরত আছেন। এক জন প্রশিক্ষণে থাকায় তিন জনেই চলছে হাসপাতাল। এই স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক দিয়েই প্রতিদিন চার শতাধিক রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে রোগীরা। একটি কক্ষে একজন চিকিৎসক সকাল থেকে রোগী দেখছেন। শীত বাড়ায় শ্বাস কষ্ট, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া সহ শীত জনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন চার শতাধিক রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসছেন। ভর্তি হচ্ছেন প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে ব্যাপক হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। এতে বাইরের বিভিন্ন বেসরকারি ডায়গনস্টিক সেন্টার এবং ক্লিনিকগুলোতে ছুটতে দেখা গেছে রোগীদের।
কয়েকজন রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, সকাল থেকে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দেখাতে হচ্ছে। এতে রোগীরা আরও অসুস্থ বোধ করছেন। কোন পরীক্ষা করতে দিলে রিপোর্ট নিয়ে আসতে দেরি হওয়ায় সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। এতে কিছুটা বাধ্য হয়েই বাইরের ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকলে রোগীদের কষ্ট কমে যেত।
শিশুর চিকিৎসা নিতে আসা মঞ্জিলা নামের একজন মা বলেন, দীর্ঘসময় ধরে বাচ্চা কোলে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। সকাল থেকে একজন ডাক্তার রোগী দেখছেন। ডাক্তার কম থাকায় আমাদের অনেক ভোগান্তি হচ্ছে।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. আসিফ আদনান বলেন, চিকিৎসক সংকট থাকায় ভর্তি রোগীদের পাশাপাশি জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে আমাদের রোগী দেখতে হচ্ছে। বর্তমানে আমরা দুই জন চিকিৎসক দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের বাইরেও পর্যাপ্ত ডিউটির মাধ্যমে রোগীদের সেবা দিচ্ছি। শীত বাড়ার সাথে সাথে শীত জনিত রোগীও বাড়ছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। আমাদের তীব্র চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। সেবা দিতে আমরা ব্যাপকভাবে হিমশিম পোহাতে হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফি মাহমুদ বলেন, বর্তমানে আমাদের হাসপাতালে তীব্র চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে এই উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী উপজেলার রোগীদেরও সেবা দিতে হচ্ছে। এতে আমাদের রোগীদেরও ভোগান্তি হচ্ছে। সংকট নিরসনে আমরা গত দুই মাসে তিনবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদা প্রেরণ করলেও এখনো কোন চিকিৎসক পদায়ন হয়নি।
সিভিল সার্জন ডা. মুহা. রুহুল আমিন বলেন, চিকিৎসক সংকট নিরসনে আমরা প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করছি। নতুন চিকিৎসক নিয়োগ না হওয়া এবং তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ কোর্সে যোগদানের কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। আশা করছি দ্রুত এই চিকিৎসক সংকট নিরসন হবে।
শাকিল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর