
২০২৪’র জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের গণহত্যার বিচার না হলে শহিদদের আত্মার সাথে বেঈমানি করা হবে উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদী আচরণে ঘটানো সবগুলো খুনের বিচার হবে।
২৪ এর গণহত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। আগে অপরাধের বিচার, তারপর অন্য কাজ। এ বিচার না হলে শহিদদের আত্মার সাথে বেঈমানি করা হবে। তাদের আত্ম কষ্ট পাবে। যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীনভাবে কথা বলার, সম্মান ও মর্যাদার সাথে চলার সুযোগ পেয়েছি তাদের সাথে বেঈমানি করতে পারবো না।
প্রায় সাড়ে ১৬ বছর পর শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে কক্সবাজারে জেলা জামায়াত আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন।
জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারীর সভাপতিত্বে সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম, প্রচার সেক্রেটারি আল আমীনসহ একাধিক দায়িত্বশীলের সঞ্চালনায় কক্সবাজার সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে ডা. শফিক আরো বলেন, দেশটা আমরা সকলের। ১৯৭১ সাথে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতার পরই সব দেশ মাথা তুলে দাঁড়ায় কিন্তু বাংলাদেশ কেবল পিছিয়েছে। কারণ দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতা পায়নি জনগণ। একেক সময় একটি দল দেশের জনতাকে পরাধীন করে রেখেছিল।
এসব দলের মাঝে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রাচীন দল আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি ফ্যাসিবাদী আচরণে দেশের মানুষকে ভোগান্তি দিয়েছে। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্বাচন আয়োজনের পূর্বে বিডিআর হত্যাসহ নানা অপকর্মে অভিযুক্ত শেখ হাসিনার বিচার শেষ করা এখন সময়ের দাবি।
জামায়াত আমীর বলেন, আওয়ামীলীগের ফ্যাসিবাদী আচরণ ও খুনি হাসিনার অপকর্ম থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনা ও বিদেশে বসে সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ ষড়যন্ত্র করছে। তাদের ফাঁদে পুলিশ বাহিনীকে পা না দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমরাও কারো উসকানিতে পা দেব না- তবে, বৈষম্যহীন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত ছাত্র-জনতার যুদ্ধ শেষ হবে না।
গত ৫৪ বছরে দেশের কোথাও জামায়াতের বিরুদ্ধে কোন অপকর্মের অভিযোগ নেই দাবি করে জামায়াত আমীর বলেন, কক্সবাজারে সাধারণের দখলের অভিযোগ শোনা যায়। যেখানে দুর্বৃত্তপনা থাকে সেখানে রাজনীতি থাকে না- সেটা অন্য কিছু। রাজনীতির ছায়ায় দখলবাজি রাজনীতি হতে পারে না। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে দেশের যেকোনো প্রান্তে জামায়াতের কেউ কোন অপকর্ম করেছে এমন প্রমাণ থাকলে দিন-তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আমরা মেজরিটি-মাইনোরিটি বিশ্বাস করি না। জুলাই বিপ্লবের পর জামায়াতের প্রতি মানুষ আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। সামনের নির্বাচনে কক্সবাজারের চারটি আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জান-মাল-ইজ্জতের পাহারাদার হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
কক্সবাজার কি সৎ মায়ের সন্তান এমন প্রশ্ন করে জামায়াত আমীর বলেন, পর্যটন রাজধানী হিসেবে কক্সবাজার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলেও এখানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই। বৈষম্যের শিকার জেলাগুলোতে উন্নয়ন পৌঁছে দেয়া জামায়াতের মূল দায়িত্ব। দায়িত্ব পেলে সবার প্রতি সমান নজর রাখা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ আবারো কোন ফ্যাসিস্টের হাতে যেন না যায় সেটা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। ভোট আপনার পবিত্র আমানত। কক্সবাজারের চার আসনে জামায়াত মনোনীতদের জয়ী করুন।
কর্মী সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সহকারি সেক্রেটারি এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, জামায়াত ইসলামিতে ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই, ধনী-গরিব তফাত নেই। আওয়ামী নিষ্পেষণের শিকার সকলে শান্তির দল জামায়াতের পতাকা তলে আসছে। দেশ স্বাধীন হলেও ৭২ এর সংবিধান দাদাদের নির্দেশে গড়া। ফলে স্বাধীনতার সুফল পাওয়া হয়নি। পাঁচবার দেশ ক্ষমতা পাওয়া আওয়ামী লীগ সাম্যের পরিবর্তে বৈষম্য ও বঞ্চনা উপহার দিয়েছে। শেখ মুজিব বিচারবহির্ভূত হত্যার সূচনা করেছিল। এরধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনা ইতিহাসকে তারা কলঙ্কিত করেছে। সবকিছু লুটেপুটে খেয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, জনতার ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। ন্যায় বিচারের জন্য ন্যায়বান শাসক দরকার। আবু সাঈদ-মুগ্ধ যে পথ দেখিয়েছে, সেই পথে হেঁটে নিজেদের অধিকার আদায় করতে হবে।
সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, শেখ পরিবার একটি চোরের খনি- লুটেরাদের খনি। দেশটাকে লুটেপুটে খাওয়ার পাশাপাশি নিপীড়নের বদলায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী পালিয়ে বাঁচেন। জামায়াত ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু চলমান সময়ে আওয়ামী লীগকেই এখন নিষিদ্ধের দাবি করছে সাধারণ মানুষ।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ধর্মের ট্রাস্টি পরিমল কান্তি বলেন, আমরা সৃষ্টির সেরা জীব। হিন্দু-মুসলিম দুজনের রক্ত একপাত্রে রাখলে আলাদা করা সম্ভব নয়। তাই শফিকুর রহমানের ভাষায় বলতে হয়, আমরা কোন ধর্মের নয়, আমরা বাংলাদেশি। সারাদেশের ভিন্নধর্মীরা ইসলামকে সমীহ করে।
বেলা ১২টায় বক্তব্য শুরু করে টানা ৩৩ মিনিট কথা বলেন প্রধান অতিথি ডা. শফিকুর রহমান। এর আগে বেলা ৯টয় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠান শুরুর পর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ আহসান উল্লাহ, চট্টগ্রাম মহানগর আমীর শাহজাহান চৌধুরি, সাবেক জেলা আমীর মোস্তাফিজুর রহমান, সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শাহজালাল চৌধুরী, জেলা নায়েবে আমীর অ্যাড. ফরিদ উদ্দিন ফারুকী, জেলা সহ-সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু তাহের চৌধুরী, শামশুল আলম বাহাদুর, কর্মপরিষদ সদস্য শফিকুল হক জিহাদি, শহর আমীর আবদুল্লাহ আল ফারুক, সাবেক মেয়র সরোয়ার কামাল, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাড. সলিম উল্লাহ বাহাদুর, শহিদুল আলম বাহাদুর প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
বক্তব্য প্রদানের নাম ঘোষণার পূর্বে চকরিয়া-পেকুয়ায় এমপি পদে মনোনীত হিসেবে আবদুল্লাহ আল ফারুক, সদর-ঈদগাঁও-রামু আসনে শহিদুল আলম বাহাদুর ও টেকনাফ-উখিয়া আসনে জেলা আমীর অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারী এবং কুতুবদিয়া-মহেশখালীতে হামিদুর রহমান আজাদকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছর কক্সবাজারে জামায়াতের প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্রোগ্রাম হয়নি। জুলাই-বিপ্লবের পর মুক্ত হওয়া জামায়াত প্রথম কর্মী সম্মেলনের নির্বাচনী ম্যাসেজ দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বোদ্ধামহল।
মুনতাসির/সাএ
সর্বশেষ খবর