
নিজ দেশে বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক কারণে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের বোঝা দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন কোনো না কোনো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় হত্যাকাণ্ড, গোলাগুলি, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণসহ বহু মাত্রিক অপরাধে জড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে উখিয়ার বালুখালীতে ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে দৈনিক লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে স্থানীয় একটি চক্র। পাশাপাশি ওই এলাকার নাম পাল্টে রাতারাতি ‘শহীদ জিয়া স্মৃতি গোল্ডকাপ’ নামকরণ করা হয়েছে। ফলে এই টুর্নামেন্ট ঘিরে হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দেয়ার পাশাপাশি আতঙ্ক বিরাজ করছে।
কাঁটাতারের বেষ্টনী ডিঙিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিকট টিকেট বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে বালুখালী এলাকায় দুই গ্রামবাসীর মাঝে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোন দু’পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা।
অভিযোগ উঠেছে, জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক হুইপ ও উখিয়া-টেকনাফের সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী, উপজেলা প্রশাসন, এপিবিএনসহ থানা পুলিশের সবুজ সংকেত পেয়ে ফুটবল টুর্নামেন্টের নামে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়া হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে টাকা ইনকামের মহোৎসবে নেমেছে পালংখালী ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি রৌসন আলী, বালুখালী ১নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মির কাশেম মিরু, সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমগীর, বালুখালী ২নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি অছিউর রহমান। মূলত এই চারজন আয়োজন কমিটির প্রধান চরিত্রে থাকলেও এই টুর্নামেন্ট ঘিরে মাদক কারবারি, রোহিঙ্গাসহ বিএনপির অঙ্গসংগঠনের বিশাল একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে ফুটবল আয়োজনের নামে উসকানি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণের কারণে বন্ধ থাকা টুর্নামেন্ট থানা পুলিশ নিজেই পাহারা দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গারা নিজেদের মাঝে সহিংস ঘটনা ঘটায়। বীভৎসভাবে খুনও করে। গণমাধ্যমে এইসব খবর প্রচারের পাশাপাশি তারা বিদেশী পিস্তলসহ নানা ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে বলে প্রচার রয়েছে। ফুলটল টুর্নামেন্টের নামে কাঁটাতার পেরিয়ে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা তরুণ-যুবক এবং নানা বয়সীরা খেলার মাঠে আসছেন। একেক দলকে সমর্থন দিয়ে ভাগ হয়ে মাঠের একেক প্রান্তে দাঁড়ায় তারা। তাদের সাথে বিদেশী পিস্তলসহ আরোও নানা ধরনের ছোট ধারালো অস্ত্র থাকতে দেখেছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ কারণে খেলার মাঠে দু’পক্ষের গন্ডগোল উঠলে ক্যাম্পের ভেতরের মতো গোলাগুলি-কোপাকুপির মত বীভৎস ঘটনা এখানেও ঘটতে পারে। এসব শংঙ্কায় মাঠের আশেপাশের স্থানীয় পরিবারগুলো চরম আতঙ্কে দিনাতিপাত করলেও কাউকে কিছু বলতে পারেনা।
ওয়াকিবহালদের মতে, প্রতিদিনের খেলা থেকে আয় হওয়া টাকার ভাগ প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে নানা স্তরে স্তরে আয়োজকরা পৌঁছে দেন বলে প্রচার রয়েছে। আর খেলা দেখতে আসার ভিড়ে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ক্যাম্প থেকে মাদক পাচার করছে সহজেই।
সচেতন গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, বালুখালী পান বাজারের দক্ষিণ পাশে ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল সংলগ্ন মাঠে জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী এই ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করেন। প্রতিদিন এই খেলা দেখার জন্য হাজার হাজার রোহিঙ্গার সমাগম ঘটে। টাকা দিয়ে টিকিটের বিনিময় রোহিঙ্গারা মাঠে প্রবেশ করে। বিশেষ করে ফুটবল খেলা দেখার নামে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ায় সচেতন নাগরিক সমাজের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। দায়িত্বরত আর্মড পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন কিভাবে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে এসে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তা নিয়ে সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের বিশাল জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে বালুখালীতে ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। টিম ফি বেশি হওয়ায় স্থানীয়রা খেলাধুলায় অংশগ্রহণ না করলেও রোহিঙ্গারা টিম নিয়ে জমজমাট রেখেছে খেলার মাঠ। রোহিঙ্গা খেলোয়াড় ও দর্শকের ভিড়ে স্থানীয়রা নাকানিচুবানি খাচ্ছে মাঠে। টাকার লোভে রোহিঙ্গা খেলোয়াড়দের জাতীয় মর্যাদা দিয়ে রোহিঙ্গা দর্শক জমায়েত করছে আয়োজকরা। কাঁটাতারের পাশ ঘিরেই মাঠে প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা দর্শকের ভিড় জমতে থাকে। মাঠের প্রবেশপথে জনপ্রতি ৩০ টাকা করে টিকেট নিয়ে দৈনিক লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। আয়োজকদের টুর্নামেন্ট পরিচালনার মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য মোটা অঙ্কের টিম ফি ও টিকেট বাণিজ্য করা। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাজনৈতিক দলের প্রভাব কাটিয়ে রোহিঙ্গাদের দিয়ে এসব বাণিজ্য করার কারণে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, রোহিঙ্গাদের টিম দিয়ে খেলাধুলা পরিচালনা ও খেলায় রোহিঙ্গা দর্শক আসা স্থানীয়দের জন্য বিরাট হুমকি। কেননা খেলাধুলায় ঝগড়া-বিবাদ কিংবা মনোমালিন্য হয়ে থাকে। স্থানীয় টিম আর রোহিঙ্গা টিমের মধ্যে যদি খেলায় ঝগড়া বা তাদের মধ্যে গন্ডগোল হয় তাহলে উগ্রবাদী রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের উপর ঝাপিয়ে পড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। স্থানীয়রা সংখ্যায় কম, ফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ খেলাধুলা পরিচালনায় স্থানীয়দের প্রাধান্য দিয়ে রোহিঙ্গা টিম বাতিল করা হউক। অন্যথায় এলাকায় স্থানীয় ও রোহিঙ্গার মাঝে সংঘাত দেখা দিবে।
অভিযোগ রয়েছে, টুর্নামেন্ট কমিটিতে অধিকাংশই অপেশাদার ক্রীড়াবিমুখ ও উৎশৃঙ্খল লোকজন লাভের আশায় টাকা দিয়ে কমিটির সদস্য হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে বড় বড় মাদক কারবারিও। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছাড়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার কোনো সদস্যকে খেলা পরিচালনা করতে দেখা যায়নি। ফলে চলমান কয়েকটি ম্যাচে আয়োজক কমিটি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রেফারিরা পক্ষপাত করেছে। রোহিঙ্গা টিমগুলোর প্রতিপক্ষদের হয়রানিসহ উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে বলে সাধারণ দর্শকদের সমালোচনা করতেও দেখা গেছে।
এইসব বিষয়ে জানতে ফুটবল টুর্নামেন্ট পরিচালনা কমিটির অছিউর রহমান ও শাহ আলমগীরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা দু’জনেই এই ফুটবল টুর্নামেন্ট পরিচালনা করতে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছেন বলে দাবি করেন। যদিওবা প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপে ওই অনুমতিপত্রের কপি পাঠাতে বললে তারা পাঠাতে কিংবা দেখাতে পারেনি।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে বলতে এখন পাগল হয়ে গেছি; এমন মন্তব্য করে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমি এই ধরনের খেলার বিপক্ষে, কারণ এখান থেকে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে৷ রোহিঙ্গারা এখন সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে৷ তারা খেলা দেখার বাহানা দিয়ে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে৷
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কামরুল হাসান চৌধুরী বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার মৌখিক অভিযোগ পেয়ে তাদেরকে একাধিকবার খেলা বন্ধ করতে নির্দেশনা দেয়ার পর একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এসে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটলে সমস্ত দায়ভার তাদের উপর বর্তাবে। এছাড়াও কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে রোহিঙ্গাদের বাইরে আসার বিষয়টি সেখানকার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখভাল করার কথা।
চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা কিভাবে বাহিরে এসে খেলাধুলায় অংশ নেয়; জানতে ৮-এপিবিএন এর অতিরিক্ত ডিআইজি ফজলে রাব্বীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন বলেন, ফুটবল টুর্নামেন্টের বিষয়ে কাউকে অনুমতি দিয়েছি কিনা এই মুহূর্তে মনে পড়ছেনা, কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।
শাকিল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর