
আওয়ামী সরকারের পতনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ইকসু) গঠনের দাবিতে সরব হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পত্র-পত্রিকা ও নিয়মিত গল্প-আড্ডায় আলাপ তুলছেন তারা। সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোও। এ নিয়ে প্রশাসনের নিকট স্মারকলিপি, গোলটেবিল বৈঠক ও মতবিনিময় সভা করেছে সংগঠনগুলো। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব দাবি নিয়ে নীরব রয়েছে। প্রশাসনের দাবি, দলীয় নির্বাচিত সরকার ছাড়া ইকসু গঠন সম্ভব নয়। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফোরাম (সিন্ডিকেট/সিনেট) চাইলে এ সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি করে ছাত্র সংসদ গঠন করতে পারে। এর জন্য জাতীয় সংসদ কর্তৃক নতুন আইন প্রণয়নের দরকার নেই। তারা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্র সংসদের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও বিদ্যমান আইনি কাঠামো দিয়ে সংবিধি ও অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে প্রশাসন চাইলে একটি নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ গঠন করতে পারে।
সংবিধি ও অধ্যাদেশ প্রণয়নের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-১৯৮০’র সিন্ডিকেট ক্ষমতা ও কার্যাবলী ২০ (জ)(ঝ) ধারায় বলা হয়েছে, চ্যান্সেলরের অনুমোদন সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সংবিধি প্রণয়ন, সংশোধন বা বাতিল করিবে এবং অধ্যাদেশ প্রণয়ন, সংশোধন বা বাতিল করবে। এছাড়াও সংবিধি প্রণয়ন ৩২ (২) ধারায় বলা হয়েছে, যেকোনো সময়ে সিন্ডিকেট সংবিধি প্রণয়ন করিতে পারবেন এবং তাহা সংশোধন বা বাতিল করিতে পারবেন ও ৩২ (৩) ধারা মতে, সিন্ডিকেট কর্তৃক প্রণীত সকল সংবিধি এবং এতদসম্পর্কে সকল সংশোধনী এবং বাতিলকৃত বিষয় চ্যান্সেলরের কাছে তার অনুমোদনের জন্য পেশ করিতে হবে। অধ্যাদেশ প্রণয়নের ক্ষেত্রেও আইনের ৩৪ ধারায় সিন্ডিকেটের ক্ষমতা প্রয়োগে কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত প্রধান প্রধান নীতিমালার কথা উল্লেখ রয়েছে। সব বিষয়ে নীতিমালা থাকবে না এটি স্বাভাবিক। ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আইনের দোহাই দেওয়া ঠুনকো অজুহাত। আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট চাইলে নতুন আইন, সংবিধি ও অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে ছাত্র সংসদ গঠন করতে পারে। আর এ সরকার তো অধ্যাদেশ জারি করছে তাহলে দলীয় সরকারের আমলে ছাত্র সংসদ গঠন করতে হবে একথা কেন বলতে হবে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আইন প্রশাসক ও আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. জহুরুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফোরাম (সিন্ডিকেট) চাইলে এ সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি করে ছাত্র সংসদ গঠন করতে পারে। কেউ কেউ নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ছাত্র সংসদ গঠনের কথা বললেও আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই এটি করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় অনেক আইনই তৈরি করতে পারলে এ সংক্রান্ত আইন কেন পারবে না? আইনের দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা উচিত না।
এদিকে প্রশাসনের এমন আইনি জটিলতার দোহাইকে ইকসু গঠনে সদিচ্ছার অভাব ও মেকি যুক্তি বলে আখ্যা দিয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলো। ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, প্রশাসন যদি সুনজর দেয় তাহলে আইনি জটিলতা কাটিয়ে ইকসু গঠন সম্ভব। আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ গঠনের উপযুক্ত সময়। কারণ দলীয় সরকারগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ চিন্তা ও পেশিশক্তি ব্যবহারের জন্য কখনোই ছাত্র সংসদ গঠনে উদ্যোগ নেবে না। ইকসু নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের মতামত নিয়েছেন বিডি২৪লাইভ’র ইবি প্রতিনিধি জিসান নজরুল।
দলীয় সরকার ইকসু গঠনে উদ্যোগী হবে না:
লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির কালো থাবাই শিক্ষার্থীদের একপেশে রাখার জন্য দায়ী। ফলে অনেকে শিক্ষার্থীই নিজেদের ক্যাম্পাস ও রাষ্ট্রের অংশ মনে করে না। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে। তাই এই থাবা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে ছাত্র সংসদ গঠন সময়ের দাবি। চব্বিশের সম্মিলিত আওয়াজে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ ও ছাত্র সংসদ গঠন করার দাবি তুলছে। এ নিয়ে আমরা উপাচার্যকে মৌখিকভাবে আহ্বান করেছি। আমরা মনে করছি অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলেই ইকসু গঠন করা যুক্তিযুক্ত। কারণ বিগত সময়ে নির্বাচিত দলীয় সরকার ইকসু গঠনে উদ্যোগী হয়নি। তাই আমরা তাদের উপরে আশা রাখতে পারি না। ইকসু গঠন করলেই হবে না; এর রূপরেখায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। ছাত্র সংসদে উপাচার্যকে বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে রূপরেখা তৈরি করতে হবে। ইকসুতে রানিং শিক্ষার্থীদের বাহিরে অন্য কেউ অংশগ্রহণ করতে পারবে না, এটাই আমাদের মৌলিক দাবি। তা না হলে ইকসু গঠনের মূল উদ্দেশ্য হাসিল হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে ইকসু গঠন সম্ভব। নচেৎ এসব মেকি যুক্তি আমরা মেনে নিব না। প্রয়োজনে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাঠে সর্বোচ্চ আন্দোলন করব, ইনশাআল্লাহ।
ইসমাইল হোসেন রাহাত
সেক্রেটারি, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ইবি শাখা
আইনের দোহাই দিয়ে ইকসু গঠনে টালবাহানা করছে প্রশাসন:
ক্যাম্পাসে একক রাজত্বের অবসান, শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠন এবং ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে ইকসু গঠন এখন সময়ের দাবি। ছাত্র ইউনিয়ন ইবি সংসদ গত কয়েক বছর ধরে ইকসু গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে কিন্তু বিগত প্রশাসনগুলো দলীয় রাজনীতির স্বার্থচিন্তা করে এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেইনি। এই প্রশাসনও নানা জটিলতার কথা বলছে। তবে আমরা মনে করি, প্রশাসন মূলত আইনের দোহাই দিয়ে টালবাহানা করছে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর নানা অপকর্মের কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাই নির্বাচিত সরকারগুলো তাদের ছাত্র সংগঠনের উপর ভরসা করতে পারে না। এ কারণে তারা ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করতে এত ভয় পায়। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলই ইকসু গঠনের উপযুক্ত সময়। ক্যাম্পাসকে শিক্ষার্থীদের জন্য আরো উন্নত, সুশৃঙ্খল এবং সবস্থান নিশ্চিত করতে ইকসু গঠন শিক্ষার্থীদের সম্বলিত দাবি। ডাকসুর আদলে ইকসুর রূপরেখা হতে পারে বলে আমরা মনে করি। এছাড়া আমরা আরো চিন্তা-ভাবনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনকে রূপরেখা দেব। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় এই বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র সংসদ গঠন না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই প্রাধান্য পাচ্ছে বলে মনে করছি।
মাহমুদুল হাসান
সভাপতি, ছাত্র ইউনিয়ন ইবি সংসদ
৪৫ বছরেও ইকসু না হওয়ায় অধিকার বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা:
শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, রাজনৈতিক সবস্থান ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করতে ছাত্র সংসদগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছরেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ গঠনের উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য ও মৌলিক অধিকার যথাযথভাবে পায়নি। এছাড়া জুলাই বিপ্লবের অন্যতম দাবি ছিল ছাত্র সংসদ গঠন। ইকসু গঠন নিয়ে প্রশাসন আমাদের আইনি জটিলতার কথা জানিয়েছে। তবে আমরা মনে করছি এসব আইনি জটিলতা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সমাধান করা সম্ভব। ছাত্রশিবির দলীয় সরকার নয় এই সরকারের আমলেই সকল জটিলতা কাটিয়ে ইকসু গঠনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার দাবি জানাচ্ছে। সেই সঙ্গে দ্রুত নির্বাচনেরও ব্যবস্থা করতে হবে। ইতিমধ্যে আমরা ইকসু গঠনে স্মারকলিপির মাধ্যমে প্রস্তাবনা দিয়েছি।
মাহমুদুল হাসান
সভাপতি, ইসলামী ছাত্রশিবির ইবি শাখা
শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে ইকসু গঠনে কাজ করব:
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব, দুর্নীতি ও অন্যায় প্রতিরোধে ইকসু গঠন করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বিএনপির ৩১ দফার ২৪ নং দফায় নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমরা চাচ্ছি ইকসু গঠনে প্রশাসন উদ্যোগ নিবে। তবে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে স্বৈরাচারী সরকারের কারণে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম অবাধে করতে পারেনি। তাই আমরা মনে করছি ইকসু গঠনে প্রশাসনকে আরো সময় নেওয়া উচিত। আমরা ইবি ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ১৯ দফার একটি প্রস্তাব ভিসি স্যারের কাছে তুলে ধরেছি। সেইসঙ্গে ইকসু গঠনে আইনি জটিলতা নিরসনে শিগগিরই পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য দাবি জানিয়েছি। আমাদের দাবি হচ্ছে, যুগোপযোগী ও শিক্ষার্থীদের চাহিদার আলোকে ইকসুর রূপরেখা তৈরি ও ইকসু নির্বাচনে রানিং শিক্ষার্থীদের প্রার্থী করা হোক। তবে স্বৈরাচারী হাসিনার কারণে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেনি ও এখনও অনেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এখন আমাদের শিক্ষার্থী ও ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে মতবিনিময় হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যেভাবে মতামত দিবে ইকসু গঠনে সেভাবেই আমরা কাজ করে যাব।
আনোয়ার পারভেজ
সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক, ইবি শাখা ছাত্রদল
ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার রোধে ইকসুর বিকল্প নেই:
শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস নির্মাণে ইকসু গঠনের বিকল্প নেই। বিগত সময়ে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ন্যায় ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার ও নৈরাজ্য পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ আমরা আর দিতে চাই না। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও বিগত প্রশাসনগুলোর অনীহায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ গঠন করা হয়নি। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর একক আধিপত্যের কারণে শিক্ষার্থীরাও ছাত্র সংসদ গঠন নিয়ে জোরালো দাবি তুলতে পারেনি। তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা ইকসু গঠন নিয়ে জোরালো দাবি তুলছেন। আমাদের দাবি হচ্ছে অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলেই ইকসু গঠন করা হোক। কারণ বিগত সময়ে দলীয় সরকারের আমলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বার্থচিন্তা করে ছাত্র সংসদ গঠনে অনীহা দেখিয়েছে। ভবিষ্যতেও এই অনীহা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ইতোমধ্যে হস্তান্তরিত স্মারকলিপিতে আমরা ইকসু গঠনের প্রস্তাব জানিয়েছি। সেই সাথে ইকসু গঠনের পরপরই দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি। তাই কোনো প্রকার টালবাহানা না করে ইবিতে ছাত্র সংসদ গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর যদি প্রশাসন টালবাহানা করে তাহলে কঠোর কর্মসূচি দিতে আমরা বাধ্য হব।
মুখলেচুর রহমান সুইট
সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ইবি শাখা
মুনতাসির/সাএ
সর্বশেষ খবর