
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ ও অঞ্চলের পণ্যে যতটা শুল্ক রয়েছে, সেই দেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিশ্বনেতারা।
বুধবার (২ এপ্রিল) হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে দেওয়া এক ভাষণে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, দশকের পর দশক ধরে আমাদের দেশ লুটপাট, শোষণ এবং নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তা বন্ধ করার সময় এসেছে। আর দিনটিকে আগেই যুক্তরাষ্ট্রের “লিবারেশন ডে” হিসেবে ঘোষণা করেছেন তিনি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে কড়া বার্তা দিয়েছে চীন। এ ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারাও কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন, মার্কিন মিত্রদেশ ইতালির জর্জিয়া মেলোনি এবং অস্ট্রেলিয়ার অ্যান্থনি অ্যালবানিজসহ আরও অনেক দেশের উর্ধ্বতন ব্যক্তিরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা শুল্কারোপ
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত একটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে এবং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে। এই শুল্কের কারণে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা ও সাধারণ ভোক্তারা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা করার খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এমনটি হলে এটি ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে প্রথম দফার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইস্পাত খাতে শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা চূড়ান্ত করছে। প্রয়োজনে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যা বললেন ট্রাম্পের ইইউ মিত্ররা
ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ওপর ধার্য করা ২০ শতাংশ শুল্ককে ‘ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ইইউর ওপর আরোপ করা শুল্ক ‘কোনো পক্ষের জন্যই উপযুক্ত হবে না’। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, স্পেন তার কোম্পানিগুলোকে ও কর্মীদের সুরক্ষা দেবে।
আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্যমন্ত্রী সিমন হ্যারিস বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করতে তৈরি আছেন। সামনে এগোনোর জন্য এটিই সর্বোত্তম উপায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও কানাডার প্রতিক্রিয়া
ইইউর বাইরে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যালবানিজ ট্রাম্পের ওই ঘোষণাকে ‘অন্যায় শুল্ক’ আরোপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, এর জন্য মার্কিনদের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে। তার দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক ধার্য করাটা ‘অন্যায্য’ বলে জানিয়েছেন তিনি। যদিও তার সরকার পাল্টা কোনো ব্যবস্থা নেবে না বলে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন।
নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্যমন্ত্রী টড ম্যাকক্লে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালী। আমরা আরও তথ্য পেতে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব এবং আমাদের রফতানি-কারকরা এই ঘোষণার প্রভাব আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।
ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং অটোমোবাইলের উপর আমেরিকান শুল্ক ’লাখ লাখ কানাডিয়ানকে’ সরাসরি প্রভাবিত করবে। আমরা পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে এই শুল্কের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আমরা জি-৭ এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলব।
দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রাজিলের প্রতিক্রিয়া
ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ব্রাজিল সরকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ মূল্যায়ন করছে, যার মধ্যে বৈধ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আশ্রয় নেয়াও অন্তর্ভুক্ত।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হান ডাক–সু বলেছেন, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধ ‘এক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে’। এই বাণিজ্য সংকট থেকে উত্তরণের পথ তার সরকার খুঁজবে বলে জানান তিনি।
পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি চীনের
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীন। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এর বিরুদ্ধে ‘দৃঢ় প্রতিক্রিয়া’ দেখাবে।
এ ছাড়া চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস এক মতামত প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ‘শুল্কের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
প্রসঙ্গত, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন নীতিতে ৫ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ হারে আরোপিত শুল্ককে সর্বজনীন ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। ইইউ, চীনসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশ ৯ এপ্রিল থেকে উচ্চমাত্রার এ শুল্কের কবলে পড়বে।
ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের পণ্য আমদানির ওপর ৩৪ শতাংশ, বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ, ভারতের ওপর ২৬ শতাংশ, জাপানের ওপর ২৪ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
শাকিল/সাএ
সর্বশেষ খবর