
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র আট দিনের মাথায়, অর্থাৎ ৪ এপ্রিল, বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের বামনগ্রামে সংঘটিত হয় এক নারকীয় গণহত্যা। স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এদিন শহীদ হন নয়জন মুক্তিকামী বাঙালি। ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান কানাই লাল প্রামানিক নামে একজন সাহসী দেশপ্রেমিক, যিনি সেই ভয়াল রাতের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
স্মরণে বিভীষিকাময় সেই রাত
দৈনিক সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কানাই লাল প্রামানিক জানান, “মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জীবন বাঁচাতে আমি, আমার ছোট ভাই বলরাম প্রামানিক এবং মামা রামনাথ সরকার কাহালু উপজেলার ওলাহালী গ্রাম থেকে বোনের বাড়ি, নন্দীগ্রামের বামনগ্রামে আশ্রয় নিই। সে সময় গ্রামকে হানাদারদের হাত থেকে রক্ষায় পালাক্রমে রাতে পাহারা দেওয়া হতো।”
১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল, রবিবার, ছিল এক জ্যোৎস্নাময় রাত। গ্রাম পাহারায় দায়িত্বে ছিলেন কানাই লাল, তার ভগ্নিপতি মনীন্দ্র সাহা ও পূর্ণচন্দ্র সাহা, প্রাণকান্ত প্রামানিক, প্রাণবন্ধু কবিরাজ, ভাগবজর গ্রামের গ্রাম পুলিশ সুখী রবিদাস, নাগরকান্দি থেকে আশ্রয় নেওয়া রবিচন্দ্র প্রামানিক, সিংড়া উপজেলার খন্দকার বরবরিয়া গ্রাম থেকে আগত রামদেব রবিদাস, ছোট ভাই বলরাম এবং মামা রামনাথ সরকার।
আক্রমণ ও গণহত্যা
এক রাজাকারের মাধ্যমে খবর পেয়ে গভীর রাতে, আনুমানিক ২টার দিকে, ১৫-২০ জন পাক সেনা ও কয়েকজন রাজাকার বামনগ্রামে হামলা চালায়। তাদের দেখতে পেয়ে পাহারাদাররা চিৎকার করে সবাইকে পালিয়ে যেতে বলেন এবং নিজেরা লাঠি হাতে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু পাক সেনারা সবাইকে ধরে ফেলে এবং বাড়ি বাড়ি ঘুরে আরও কয়েকজনকে আটক করে। শুরু হয় তল্লাশি ও লুটপাট।
আটককৃতদের মধ্যে পাহারাদার ১০ জনকে আলাদা করে গ্রামের সুখ-দুখ পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে একটি নালার ধারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সবাইকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে একে একে গুলি করে নালায় ফেলে দেওয়া হয়।
প্রাণে বেঁচে যাওয়া কানাই লালের বর্ণনা
কানাই লাল বলেন, “আমার গায়ে চাদর ছিল। আমাকে তিনটি গুলি করে, লাথি মেরে নালায় ফেলে দেয়। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরে দেখি সূর্য উঠছে, মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। হামাগুড়ি দিয়ে নালার ওপর উঠে দেখি আমার ভাই বলরাম জলজল করছে। পুকুর থেকে গামছা ভিজিয়ে ভাইয়ের মুখে জল দিই, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মারা যায়।”
“গ্রামের লোকজন আমাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যায়। এরপর আমার জীবন যেন পাল্টে যায়,”—বললেন তিনি।
উপেক্ষিত আত্মত্যাগের আর্তনাদ
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আজ আমি এরুইল বাজারে একটি ছোট হোটেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। সেদিন আমার ভাই, মামা, ভগ্নিপতিসহ কত স্বজনকে হারালাম। কিন্তু এত বছরের পরেও কেউ আমাদের সেই আত্মত্যাগের যথাযথ মর্যাদা দেয়নি। না কোনো সরকার, না কোনো সংগঠন।”
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর